ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

কর্ম ও খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত

কর্ম ও খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত
×

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

শিল্প-উদ্যোক্তা, বহুমুখী প্রতিভাধারী, দূরদর্শী কর্মপরিকল্পক, সুচারু সংগঠক লতিফুর রহমানকে চিনি-জানি দীর্ঘদিন থেকে। যতবার তার মুখোমুখি হয়েছি ততবারই তার বিনয়াবত আচরণে মুগ্ধ হয়েছি। তার বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা তিনি বাস্তবায়িত করেছেন তার চিন্তার প্রসারতার কারণে। ব্যবসাকে তিনি বহুমুখী করেছেন। নীতিতে ছিলেন অটল। সৎ, নিষ্ঠাবান, ত্যাগী, আদর্শবান এই মানুষটি আমাদের মাঝে আজ নেই বটে; কিন্তু তার কর্মের ছাপ রয়েছে চারদিকে এবং এ কারণেই তিনি আমাদের কাছে স্মরণযোগ্য হয়ে থাকবেন। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করি।
কথাটা অনেক পুরোনো কিন্তু এর সত্যতা কখনও ম্লান হবে না। এটি চিরন্তন কথা। কথাটা হলো- একজন মানুষ বেঁচে থাকেন তার কর্মের মাঝে। আমার কর্মজীবনের বিভিন্ন ধাপে, অবসরকালীন জীবনের বাঁকে বাঁকে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে এবং প্রায় প্রতিবারই একটি কথাই আমার মনে হয়েছে- তিনি একজন বিনয়াবনত পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তার নীরব প্রস্থান ঘটেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়ার নিজের তৈরি আবাসে, যেখানে তারই রচিত স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে অনেক। জেনেছি স্বাধীনতার পর পারিবারিক জুট মিলটি রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে গেলে বড় রকমের আর্থিক দুর্গতিতে তিনি পড়েছিলেন। তারপর আবার শূন্য থেকে তার শুরু। স্বচ্ছতা-সততা-নিষ্ঠার সঙ্গে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। এই চলার পথ ক্রমেই প্রশস্ত হতে থাকে।
প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্নের এই কারিগর একের পর এক গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটিই আলোকিত হয়ে ওঠে। যুক্ত হন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও। একটি ইংরেজি, একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা এবং রেডিও ছাড়াও প্রকাশনা জগৎ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তার প্রতিষ্ঠানের কর্মধারা। মেধা, দূরদর্শী ভাবনা, সময়োপযোগী উদ্যোগ এসব কিছুই তাকে নিয়ে যায় ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। তাই যথার্থই বলা হয়েছে- তিনি ছিলেন, তিনি আছেন। তাকে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা বললেও নিশ্চয়ই বোধ করি অত্যুক্তি হবে না। আজ তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে বসে দুটি মর্মান্তিক ঘটনা মনে পড়ছে এবং আমাকে বিষণ্ন করে ফেলেছে। হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারান তার নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন ও এর অনেক আগে তার ছোট মেয়ে শাজনীন তাসনিম নৃশংস হত্যার শিকার হয়।
নীতিনিষ্ঠ লতিফুর রহমানকে নীতির উদ্যোক্তা বলাও যথার্থই মনে করি। তার প্রতিষ্ঠিত ট্রান্সকম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল ১৬টি প্রতিষ্ঠান। তিনি ছিলেন ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ১ জুলাই ২০২০ তারিখে যখন তার চিরপ্রস্থানের সংবাদটা পাই তখন চোখের সামনে এসবই ভেসে উঠছিল। স্মৃতিপটে অনেক কিছুই নাড়া দিচ্ছিল। একজন মানুষ এত কিছুর কর্ণধার হয়েও কীভাবে নিরহংকারী ও বিনয়ী থাকতে পারেন এর অন্যতম দৃষ্টান্ত লতিফুর রহমান। এরকম মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে অসংখ্য নয়। তিনি সত্যিকার অর্থেই স্থায়ী সম্পদ গড়তে চাননি; চেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠান গড়তে। এরই অনেক নজির তিনি আমাদের সামনে রেখে গেছেন।
তার চিরপ্রস্থানে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো, শিল্পের আরও প্রসার ঘটত। তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে যেমন অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন, তেমনি গোটা সমাজেই হয়ে থাকবেন স্মরণীয়। দেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ব্যাপক এবং নিঃসন্দেহে বিস্তৃত। এমন এক সময় তাকে আমরা হারালাম যখন আমরা, প্রিয়জন, শুভানুধ্যায়ী, তার কর্মীবাহিনী ও বিভিন্ন স্তরের গুণগ্রাহীরা তাকে সম্মিলিতভাবে বিদায়ও জানাতে পারিনি। করোনা-দুর্যোগ আমাদের আর কত মর্মন্তুদতার মুখোমুখি করবে, তা ভাবলেও শিউরে উঠি। কোথায় এর শেষ আমরা কেউ তা জানি না।
'শূন্য থেকে আবার শুরু'- শিরোনামে তার লেখা নিবন্ধে তিনি তার কর্মময়-সৃষ্টিশীল জীবনের অধ্যায়গুলো তুলে ধরেছেন। বংশানুক্রমিক অবস্থাসম্পন্ন লতিফুর রহমান জীবনে বহু প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ফের ফিরিয়ে আনেন সেই পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্যের ছন্দ। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তিত্ব লতিফুর রহমান দেখিয়ে গেছেন কী করে প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়; কর্মী-কর্মকর্তাদের কীভাবে স্বাধীনতা দিয়ে কর্মদক্ষ করে গড়ে তুলতে হয়। কর্মকর্তা-কর্মীবাহিনীই যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে তাদের শ্রমে-ঘামে বিকশিত করেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যতদূর জানি বিদেশি কর্মী-কর্মকর্তা ছিলেন না। তার অনেক প্রতিষ্ঠানই দেশি-বিদেশি স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
তিনি শুধু একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তা কিংবা সংগঠকই ছিলেন না; মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত বড় মাপের একজন। শিল্প জগতে যে ক্ষেত্রেই তার স্পর্শ লেগেছে সে ক্ষেত্রেই আলো ছড়িয়েছে। প্রতিভাবান ও অনুভূতিসম্পন্ন, দূরদর্শী এমন মানুষ কমই দেখেছি। প্রতিভাবান মানুষদের অনুভূতিশীলতা এমনিতেই সাধারণ মানুষের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। তাদের চৈতন্যজগৎ দীপ্ত ও দ্যুতিময়। অল্প আঘাতে তারা কুঁকড়ে যান না। তাদের ইচ্ছা-স্বপ্ন, পথ ও প্রাপ্তি সাধারণ মানুষ থেকে বিপুলভাবে আলাদা। লতিফুর রহমানের জীবনপঞ্জির দিকে তাকালে এসবই প্রতিভাত হয়।
তিনি কর্ম ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক- এ কথাও বলা যায় অকুণ্ঠ চিত্তে। সততা বজায় রেখে কীভাবে ব্যবসায় সফল হতে হয় এরও অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি। আমরা জানি ব্যবসা ক্ষেত্রে সততা বড় বেশি অপরিহার্য। অসৎ পথে উপার্জন হয়তো অনেক বেশি করা যায় কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সততার মাধ্যমে অর্জিত সবকিছুরই শক্তিও অনেক বেশি। লতিফুর রহমান চাইলে বিশ্বের যে কোনো দেশেই থিতু হতে পারতেন, দ্বিতীয় নিবাসও (আজকের বাস্ততায় এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই) গড়তে পারতেন। কিন্তু না, দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে তার স্বপ্নের জগৎটা ছিল অনেক বিস্তৃত; তাই তিনি যা কিছু করেছেন এ চিন্তা থেকেই করেছেন। এও এক অনুকরণীয়-অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
সততা ও নিষ্ঠার উদাহরণ লতিফুর রহমানকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে কিছু লেখা দুরূহ। আমাদের দেশে সৎ পথে, নৈতিকতার গি বদ্ধ থেকে ব্যবসা কিংবা শিল্প জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সেরকম মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কর ফাঁকি দেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া, রাতারাতি ধনী হওয়ার সবরকম অপচেষ্টা চালানো অনেকেরই সহজাত প্রবৃত্তি। দোষেগুণেই মানুষ। তবে কার দোষ কতটা, গুণ কতটা সেটিই পরিমাপযোগ্যতার বিষয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে লতিফুর রহমান নৈতিকতা সম্পন্নতার একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি।
লতিফুর রহমান ১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট জন্মেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়িতে। দেশবিভাগের পর ঢাকায় আসেন। তৎকালীন ঢাকার অভিজাত এলাকা গেন্ডারিয়ায় বসবাস গড়েন পরিবারের সঙ্গে। তবে পড়াশোনা করেন শিলং ও কলকাতায়। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যবসায়ী সমাজের নেতৃত্বও দিয়েছেন সফলভাবে। তিন দফায় প্রায় সাত বছর ছিলেন দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি। বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সহসভাপতি ছিলেন। সর্বত্রই রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিও-এর পরামর্শকও ছিলেন।
এখানেই শেষ নয়। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিস্তৃত এই কর্মপরিধিই বলে দেয় তার দক্ষতার উচ্চতা কতটা। তিনি দেশ-বিদেশের অনেক অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। কিন্তু এসব কিছুর চেয়েও তার বড় অর্জন মনে করি ট্রান্সকম গ্রুপের কর্মকর্তা-কর্মীদের অগাধ ভালোবাসা-শ্রদ্ধা অর্জন। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মূল্যবোধের আদর্শের মেলবন্ধন ঘটানোটা সহজ কাজ নয়। তিনি তাও করে গেছেন সফলভাবেই। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান নেওয়া লতিফুর রহমানকে জানাই আবারও শ্রদ্ধা। আবারও বলি, তিনি শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে নেই বটে; কিন্তু অনেকের ধারণা বদলে এই মানুষটি তার কর্মের জন্যই আমাদের মাঝে থাকবেন তার স্বকীয়তায়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন

আরও পড়ুন

×