ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

নারী নেতৃত্ব

রাজনীতির দায় ও কমিশনের দায়িত্ব

রাজনীতির দায় ও কমিশনের দায়িত্ব
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

এটা অনস্বীকার্য যে- সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন সর্বত্র নারীর অবস্থান ও অগ্রগতি আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সকল কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণে দেশের উন্নতিও লক্ষণীয়। তা সত্ত্বেও নারী এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। নারীকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তারই আলোকে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের (আরপিও) ৯০-এর বি ধারায় ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ আমরা দেখছি, নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সময়সীমা উঠিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই বিধানটি তুলে দেওয়ারই চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বৃহস্পতিবার সমকাল ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা যথার্থই বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এ উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা এই সময়সীমাকে আরও ৫-১০ বছরের জন্য বর্ধিত করে তা বাস্তবায়নের জন্য যে রোডম্যাপের কথা বলছেন তার সঙ্গেও আমরা বহুলাংশেই একমত।
আমরা জানি, সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতিতে জেন্ডার সমতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণের জন্য এখনও আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। মূলধারার রাজনীতিতে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়লেও, এমনকি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও সর্বস্তরে কিন্তু ক্ষমতায়নের ভারসাম্য তৈরি হয়নি। দেশের বড় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর সংখ্যা ১৫ শতাংশের বেশি নয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নারীর সংখ্যা একটু বেশি হলেও জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও কম। সংসদেও সব মিলিয়ে নারীর সংখ্যা ২১ শতাংশের বেশি নয়। এ অবস্থায় আরপিওতে নারীর অন্তর্ভুক্তির ধারাটি বাতিল করা অযৌক্তিক বলেই আমরা মনে করি। ধারাটি বহাল থাকলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব হবে। এ বিষয়টিকে রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
যেখানে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীই নারী সেখানে তারা যদি রাজনীতির সর্বস্তরে সমানভাবে অংশ না নেয় তাতে নারীর ক্ষমতায়নও নিশ্চিত হবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকল শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্যও নারীকে যথার্থ সংখ্যায় নেতৃত্বে আসতেই হবে। সংসদে, স্থানীয় সরকারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ালে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে আইনেরও বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি। এ অবস্থায় গোলটেবিল আলোচনা হতে আইনে সময়সীমা বাড়িয়ে তা বাস্তবায়নের যে রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ নেওয়া হয়েছে সেটি নির্বাচন কমিশন আমলে নেবে বলেই আমরা প্রত্যাশা করি।
আমরা দেখেছি, নারীর অন্তর্ভুক্তির এ দাবিটি বিভিন্ন পর্যায় থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনেও নারীর অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক, অগ্রহণযোগ্য ও সংবিধানবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারাও আইনে নারীর অন্তর্ভুক্তির সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
আমরা মনে করি, আরপিওর এমন গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনতে নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংবিধানেই নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বাস্তবে এ অধিকার দিতে হলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, ২০০৯ সালে আইনটি করার পর ১১ বছরে নারীরা অনেকটাই এগিয়েছে বটে; কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনও ৩৩ শতাংশের অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি কেউ কেউ নারীর অন্তর্ভুক্তি ৪০-৫০ শতাংশ করারও দাবি জানিয়েছেন। সেদিক থেকেও বর্তমান পরিসংখ্যান হতাশাজনকই বটে। আর এ অবস্থায় এটা তুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা দুঃখজনক।
আমরা মনে করি, চাইলেই নির্বাচন কমিশন এ সংশোধনী আনতে পারে না। এজন্য বিষয়টি জাতীয় সংসদে পাস করতে হবে। সেক্ষেত্রে সংশোধনীর মূল ক্ষমতাটা রাজনৈতিক দলের হাতেই থাকছে। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকেই বিষয়টি ভাবতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো আইন প্রণয়ন হোক, তা নিশ্চয় আমাদের সংসদ সদস্যগণ চাইবেন না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে বর্তমানে অন্তত যারা নারী সদস্য রয়েছেন তারা জোরালো ভূমিকা রাখবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নারী সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তর থেকেও দাবি তুলতে হবে। আমরা নারীর নেতৃত্ব সৃষ্টি ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি নারীর কাজের জন্য অনুকূল পরিবেশও নিশ্চিত করতে জোর দাবি জানাচ্ছি।

আরও পড়ুন

×