অন্যদৃষ্টি
বুড়িগঙ্গায় স্বপ্নডুবি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর- ফাইল ছবি
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১৪:৫৮
আমরা নিজেদের এবং পরিবার-সমাজ-দেশকে নিয়ে কত কিছুই না স্বপ্ন দেখি। জাগতিক ইতিবাচক বিষয়গুলো ঘুরপাক খায় আমাদের ভাবনার জগতে। এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে নিজেকে গড়ে তুলি সমাজের ক্ষুদ্র কোনো অংশ থেকে। যার মূলে থাকে পরিবার-আত্মীয়স্বজনের অকল্পনীয় ত্যাগ। কিন্তু মুহূর্তেই সেই স্বপ্ন-ত্যাগ-প্রচেষ্টাকে মূল্যহীন করে দিতে পারে ভাবনাহীন-কল্পনাহীন কোনো দুর্ঘটনা। গত ২৯ জুন তেমনই ঘটনার একটি পুনরাবৃত্তি ঘটল বুড়িগঙ্গার বর্জ্যমিশ্রিত পানিতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাশে পরিণত হলেন প্রায় অর্ধশত সুস্থ-সবল মানুষ। মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়ে তীরে নোঙর করার আগেই বুড়িগঙ্গায় ডুবে গেল অর্ধশতাধিক পরিবারের স্বপ্ন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘাটের কিনারায় আসা মাত্রই বিপরীত দিক থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চ প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয় মর্নিং বার্ড লঞ্চকে। এ মর্মান্তিক ঘটনা নৌযাত্রীসহ সর্বসাধারণকে ভীত-সন্ত্রস্ত ও বাকরুদ্ধ করেছে। এ ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের অনেকেই হয়তো পরিবারের একমাত্র উপার্জনাক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের ওপর নির্ভরশীলরা তাদের দিকে তাকিয়েই ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বুনতেন। এ ঘটনায় কেউ বাবাকে হারিয়েছেন, কেউ মাকে হারিয়েছেন, আবার কেউ হারিয়েছেন ভাই কিংবা বোনকে। এখন স্বজনহারাদের কী হবে? তাদের জীবন-জীবিকার ভার কে নেবে?
ময়ূর-২ লঞ্চের চালকের ভুল, অসাবধানতা বা অন্যায়- যে কারণেই হোক না কেন এ মর্মান্তিক ঘটনার দায় কিন্তু লঞ্চ মালিক পক্ষ এড়াতে পারে না। বিগত সময়ে আমরা সড়কপথে যে দুর্ঘটনাগুলো দেখেছি, তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই ঘটেছে এমন দায়িত্বহীনতার কারণে। কখনও চালক ঘুমিয়ে পড়ার কারণে, আবার কখনও চালকের সহকারী চালকের আসনে বসার কারণে ঘটেছে অনেক দুর্ঘটনা। ময়ূর-২ এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সমকালের এক প্রতিবেদনে ময়ূর-২ এর সাবেক একজন চালকের বক্তব্য উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন- লঞ্চটিতে কোনো চালক ছিলেন না। একজন মাস্টার চালাচ্ছিলেন লঞ্চটি। এটা নিছক কোনো ভুল নয় বরং অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি লঞ্চ মালিক পক্ষের প্রাপ্য।
নৌপথে দুর্ঘটনার জন্য ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী পরিবহন, যান্ত্রিক ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন নৌযান, অদক্ষ চালক ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করা হয়। মূলত আমাদের দেশে নৌযান তদারকির বালাই নেই বললেই চলে। নৌপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ফিটনেসবিহীন। যেগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, সেগুলোও ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় সনদপ্রাপ্ত হয়েছে তা নিয়ে সংশয় থাকা অমূলক নয়। এর ওপর ফিটনেসবিহীন এসব নৌযানে যাত্রী পরিবহন করা হয় আকারের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও তা নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছে নৌযানগুলো। চলাচলের আগে ও পরে নৌযানের যন্ত্রাংশগুলো ঠিক আছে কিনা তাও দেখার প্রয়োজনবোধ করেন না অনেক মালিক। বাংলাদেশে সড়ক ও নৌপথে যাত্রী পরিবহনে সেবার চেয়ে মুনাফার দিকই বেশি বিবেচনা করে থাকেন মালিকরা। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা মালিকপক্ষের অবহেলার কারণে ঘটলেও তারা বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পান। সমকালের একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- নৌ থানায় দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ডজনখানেক মামলা ঝুলন্ত রয়েছে। আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং সাক্ষীর অভাবে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। গত ২৯ জুনের দুর্ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মামলার আসামি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক নিঃসন্দেহে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ মামলাটি যেন গতানুগতিকভাবে ঝুলে না থাকে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনার আদলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটতেই থাকবে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সঙ্গত কারণেই নৌপথ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নৌপথকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস সনদ যেন যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয় তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নৌযান তদারকি ও নৌপথে নিরাপত্তা টহল জোরদার করতে হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে তৎক্ষণাৎ তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যান্য সেবার মতো নৌ সেবারও জরুরি সেবা বা অভিযোগ কেন্দ্র চালু করতে হবে। যাত্রীদের সচেতনতার সঙ্গে নৌযানে যাতায়াত করতে হবে। অসঙ্গতিপূর্ণ কিছু মনে হলে জরুরি সেবায় যোগাযোগ করতে হবে। মালিকদের সেবার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
সাংবাদিক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- সাইফুল ইসলাম