ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

লাল সবুজ হলুদ সমাচার

লাল সবুজ হলুদ সমাচার
×

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১৪:৫৮

আমার পরিচিত এক যুবক গিয়েছিল বিআরটিএ অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ইন্টারভিউ দিতে। ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, রাস্তার মোড়ে বা ট্রাফিক আইল্যান্ডে যে লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি জ্বলতে দেখা যায়, এগুলোর কোনটা দিয়ে কী বোঝানো হয়? যুবক জানাল, ওই বাতিগুলোর মর্ম সে বোঝে না। বোর্ডের সদস্যরা বিস্টম্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে বললেন, বলেন কী! ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে এসেছেন, অথচ ট্রাফিক সিগন্যালের বাতি বোঝেন না! যুবক বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল, না স্যার, আমি বুঝি না এগুলোর কাজ কী। কারণ আমি যখন রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হই, তখন শুধু লাঠি দেখি। লাঠির ইশারায় গাড়ি থামাই, আবার লাঠির ইশারায় গাড়ি চালাতে শুরু করি। যুবক কী বোঝাতে চেয়েছে পরীক্ষক তা ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। যুবক ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছিল।

আমরা যদি ঢাকা মহানগরীর রাস্তায় বের হয়ে দৃষ্টিকে প্রসারিত করি, ট্রাফিক সিগন্যালে বাতি নিজের মতো জ্বলছে আর নিভছে। অন্যদিকে লাঠি হাতে ট্রাফিক কনস্টেবল গলদঘর্ম হচ্ছেন যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে। কোথাও দেখা যায়, যেই সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছে, অমনি ট্রাফিক পুলিশের লাঠির ইশারা গাড়ির গতি রুদ্ধ করে দিচ্ছে। আবার যখন লাল বাতি জ্বলে ওঠে, তখনই তার ইশারায় চলতে শুরু করে গাড়ি। কোথাও কোথাও তাতেও কাজ হয় না। রাস্তার মাথায় আড়াআড়ি করে দড়ি টাঙিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় ট্রাফিক! শুধু কি তাই? ঢাকা শহরের বেশ কিছু রাস্তায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণের জন্য মোটা-চিকন বাঁশের ব্যবহারও দৃশ্যমান। লাঠি আর দড়ি দিয়েই যদি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এবং প্রতিদিন বিদ্যুতের অপচয় করে ইলেকট্রনিক সিগন্যাল বাতি লাগানোর দরকারটা কী?

ভিন্ন একটি কারণে প্রসঙ্গটির অবতারণা। কয়েক সপ্তাহ গত হতে চলল, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশকে লাল, হলুদ ও সবুজ- এ তিন জোনে ভাগ করার কথা শোনা গেল। ঢাকাকেই ভাগ করা হলো ৪৫টি এলাকায়। বলা হলো পর্যায়ক্রমে এসব এলাকায় লকডাউন 'কার্যকর' করে করোনাকে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু হা হতোস্মি! এখন পর্যন্ত সে ঘোষণার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিভাগ জোন ঘোষণা করে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নির্ভার হলো। আর সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় শুরুতেই অত্যন্ত স্পষ্ট বাংলায় বলে দিলেন যে, শুধু জোন ভাগ করে দিলেই হবে না, বাড়ি ও রাস্তার সুনির্দিষ্ট ম্যাপ করে না দিলে লকডাউন কার্যকর করা যাবে না। ব্যস, শুরু হলো এ নিয়ে কথা চালাচালি। আর তা এখন পর্যন্ত চলছেই।

রেড, ইয়েলো আর গ্রিন জোন ঘোষণার পর পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে ওইসব এলাকার যেসব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশা ও উদ্বেগজনক। গত ২৩ জুনের সমকালে 'আসল রেড জোনে নেই লকডাউন' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা পাঠান্তে যে কারও প্রতীতি জন্মাবে যে, রেড জোন ও লকডাউন নিয়ে একটি হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, উচ্চ সংক্রমিত রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বেশকিছু এলাকা বাদ রেখে শুরুতেই কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লকডাউন দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, করোনা বিস্তার রোধে আগে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে লককডাউন দিতে হবে। অবশ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যেসব এলাকায় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোকে শুরুতে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ধাপে ধাপে অন্য এলাকাগুলোকেও এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সে প্রস্তুতি কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে বা আদৌ তা সম্পন্ন হবে কিনা।

সমকালের ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, দেশে করোনায় মোট আক্রান্তের ৫৬ শতাংশ রাজধানীতে হলেও এখানে লকডাউন কার্যকরের কোনো খবর নেই। রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত এলাকাসমূহে কবে লকডাউন কার্যকর করা হবে তা অনিশ্চিত। সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষকেও ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়বে না যে, করোনা প্রতিরোধে সরকার এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার অধিকাংশ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারণে। তারা একদিকে যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, অন্যদিকে সরকারের অপরাপর বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ও করতে পারেনি। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত বিভাগগুলোর মধ্যে কি প্রয়োজনীয় সমন্বয় দেখা গেছে? করোনা সংক্রান্ত প্রতিদিনের আপডেট কারা প্রকাশ করবে- আইইডিসিআর নাকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এ নিয়ে টাগ অব ওয়ারের খবর কি শোনা যায়নি?

নিজেদের, মানে জনসাধারণের দিকে একটু চোখ তুলে তাকাই। সমন্বয়হীনতার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, করোনার থাবা থেকে দেশবাসীকে রক্ষার জন্য সরকার নানা রকম পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের সেসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আমরা, মানে জনসাধারণ কী করেছি তা কি একবারও ভেবে দেখেছি? আমরা কতটুকু মেনে চলেছি বা চলছি সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি কিংবা বিধিনিষেধ? সরকার লকডাউন ঘোষণা করে, বাইরে যেতে নিষেধ করে, গেলেও মুখে মাস্ক পরিধানের পরামর্শ দেয়। আর আমরা কী করছি?

গত ২৭ জুনের সমকালের তৃতীয় পাতায় প্রকাশিত 'রেড জোনে যেন চলছে সমাবেশ' শীর্ষক খবর ও দুটি ছবি এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ। শিরোনাম দেখেই আন্দাজ করা যায়, ভেতরে কী খবর আছে। প্রতিবেদক আগের দিন শুক্রবার নগরীর রেড জোন ঘোষিত এলাকা মগবাজারে সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেছেন, ওই এলাকার বাসিন্দাদের যেখানে অধিকতর সতর্ক থাকার কথা, সেখানে তারা কোনো রকম প্রটেকশন ছাড়াই মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন পথেঘাটে! খবরের সঙ্গে মুদ্রিত ছবিটি দেখলে চক্ষু ছানাবড়া না হয়ে যায় না। লোকজন সামাজিক দূরত্ব না মেনেই হাঁটাচলা, বেচাকেনা করছে। অধিকাংশের মুখে মাস্কের বালাই নেই। একই পাতায় ছাপা হয়েছে নিউমার্কেট এলাকার এক নম্বর ফুট ওভারব্রিজের একটি ছবি। তা দেখে মনে হয় যেন ঈদ বা পূজার বেচাকেনা চলছে। এসব দেখলে কার মনে হবে আমরা একটি কঠিন রোগের সংক্রমণের মধ্যে আছি? শুধু কি ওই দুটি এলাকা? খবর নিলে দেখা যাবে দেশের প্রায় সর্বত্রই একই অবস্থা। এ ক্ষেত্রে আমরা কাকে দায়ী করব?

নিবন্ধের শুরুতে লাল, সবুজ, হলুদ ট্রাফিক সিগন্যালের কথা বলেছিলাম। সে যুবকের মতো আমরাও এখন লাল-সবুজ-হলুদ জোনের মাজেজা অনুধাবন করতে অক্ষম। রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল যেমন অকার্যকর, কেউ ওসবের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না, তেমনি করোনা প্রতিরোধে তিন রঙের জোন ঘোষণারও একই অবস্থা। ঘোষণায়ই তা সীমাবদ্ধ আছে। সরকারের এ ঘোষণা কার্যকর করে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে আমাদেরও যে দায়িত্ব আছে, আমরা যেন তা বিস্মৃত হয়েছি। এমন অপরিণামদর্শী উদাসীনতা ও নির্বিকারত্ব আমাদের কোন পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, উদ্বেগের বিষয় সেটাই।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×