দুর্যোগ
আশীর্বাদের বন্যায় নদী ভাঙনের অভিশাপ
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২০ | ০১:২২
এবার বন্যাটা অন্যরকম। বন্যা বাংলাদেশের চিরায়ত প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, সন্দেহ নেই। বন্যার মাধ্যমেই আমাদের শুকনো মাটি সোঁদা হয়, পলির পরত পড়ে উর্বরতা রক্ষা হয়। বন্যা তো এক অর্থে আশীর্বাদ। মৌসুমি বন্যা সাধারণত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ে বা পাদদেশে অতি বর্ষণ থেকে সৃষ্টি হয়ে নদী অববাহিকাগুলো ধরে ক্রমেই নামতে নামতে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মেশে। বন্যার পানি যখন বাড়তে থাকে এবং যখন নেমে যেতে থাকে, তখন নদনদীতে ভাঙনও নতুন নয়। শুকনো মৌসুমে যেসব স্থান আলগা হয়ে থাকে, বন্যার প্রথম তোড়ে ভেসে যায়। আবার বন্যায় কয়েক সপ্তাহ ভিজে যেসব স্থান আলগা হয়, পানি নামার সময় স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হওয়ার ফলে ভেঙে যায়। কিন্তু এবারের বন্যা 'অন্যরকম' এই কারণে যে, শুরু থেকেই দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন।
সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করছি- 'কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও বন্যার পানি নামছে ধীরগতিতে। ফলে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। নদনদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। একের পর এক নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বানভাসি মানুষ। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী মানুষের ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে।' (সমকাল, মুদ্রণ সংস্করণ, ৩ জুলাই, ২০২০)।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল- 'বানভাসি মানুষ নদী ভাঙনে দিশেহারা'। বিভিন্ন নদী অবাহিকার মানুষের সঙ্গে আমার এমনিতেই প্রায়শই কথাবার্তা হয়। এবার বন্যার শুরু থেকে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, পরিস্থিতি দিশেহারা হওয়ার মতোই। অনেকে আমাকে বলেছেন, এবারের মতো ভাঙন নিকট অতীতে দেখেননি। এমন সাক্ষ্য সংবাদমাধ্যমেও এসেছে, বলা বাহুল্য। যেমন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের কাছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার প্রবীণ বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেছেন- 'এই জীবনে সাত-আটবার বাড়ি ভাঙছে নদী। কিন্তু এদোন ভাঙন দেখি নাই। চোখের পলকে হামার গাছপালা, ঘর সউগ ভাসি গেইল।' ভাঙন থেকে যদি ঘর ও আসবাবপত্র সরানোরই সময় না পাওয়া যায়, দিশেহারা না হয়ে গতি কি?
আমরা জানি, এবার যেন দুর্যোগের শেষ নেই। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের অতিমারি তো আছেই, বঙ্গীয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে একে একে যোগ হয়ছে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা। স্বাভাবিক সময়ে কষ্ট করে হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায়; কিন্তু দুর্যোগের সময় সেটা কীভাবে সম্ভব? তার মানে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে ভাইরাসজনিত দুর্বিপাকে পড়ার শঙ্কা অমূলক নয়।
এবার যেন সবকিছু বেশি বেশি, সবকিছু আগে আগে। আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম মে-জুন ও অক্টোবর-নভেম্বর মাস। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলেও সেগুলো ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে খুব একটা দেখা যায় না। এবার সেটাই ঘটেছে। প্রথম নিম্নচাপটি কোনোরকমে কেটে গেলেও আম্পান তৈরি হতে সময় লাগেনি। মে মাসে আম্পানের প্রভাব কাটতে না কাটতেই উঠে এসেছে নিসর্গ। মৌসুমের শুরুতে এভাবে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আমরা কবে দেখেছি? ওদিকে বছরে ঘূণিঝড়ের দ্বিতীয় মৌসুম এখনও পড়েই রয়েছে।

বন্যাও দেখা যাচ্ছে মৌসুমের শুরুতেই চলে এসেছে। বন্যার মৌসুম ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ ও জমাট। জুন থেকে শুরু হয়, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। মানে বর্ষা ও শরৎকাল পুরোটাই। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে আগেই বলা হয়েছিল যে, এ বছর দুই দফা বন্যা আসতে পারে। আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণের আশঙ্কা, মৌসুমি বন্যার বাইরেও প্রবল বর্ষণের কারণে ছোট ছোট নদী অববাহিকায় আরও দুই একটি 'স্থানীয়' বন্যা হতে পারে। শুধু বাংলাদেশে নয়, উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরার পাবর্ত্য অঞ্চলে এবার বর্ষার প্রথম থেকেই বর্ষণের যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা গত অনেক বছর দেখা যায়নি। হিমালয় অঞ্চলের এই বর্ষণ গড়িয়ে যখন পাদদেশে আসবে তখন পরিণত হবে সাধ্যমতো বন্যায়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৌসুমের শুরুতেই বন্যা হওয়ার কারণ এবং শুরু থেকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণেও এবার বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। একটির রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি আসতে পারে। ঠিক যেমন ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে আম্পান ও নিসর্গের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি বন্যার ক্ষেত্রেও হতে পারে। কথা হচ্ছে, শুধু বন্যা হলে দুশ্চিন্তা ছিল না। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশের রয়েছে। মূল আশঙ্কার বিষয় নদী ভাঙন। কথায় আছে- বন্যায় সব ভেসে গেলে বা ঘূর্ণিঝড়ে সব উড়ে গেলেও পায়ের নিচের জমিটুকু থাকে। কিন্তু নদী ভাঙন সব নিয়ে যায়। পায়ের নিচের মাটিটুকও রাখে না। কাজী নজরুল ইসলামের গানে আছে নদীর খেলায় সকাল বেলার আমির সন্ধ্যাবেলায় ফকিরে পরিণত হয়। এই চিত্রকল্প যে মোটেও রূপক নয়, বরং নিরেট বাস্তব, নদী ভাঙনের শিকার মানুষ মাত্রই জানেন। যে কারণে নদী ভাঙনের শিকার জনগোষ্ঠীর কাছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা করোনাভাইরাস অপেক্ষাকৃত কম মারাত্মক দুর্যোগ বিবেচিত হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এবার বন্যায় কেন নদী ভাঙনের আধিক্য। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও ভূতাত্ত্বিকরা এর ব্যাখ্যা আরও ভালো দিতে পারবেন। আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণে আশীর্বাদের বন্যায় অভিশাপের নদী ভাঙনের প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, বছরভর প্রবাহস্বল্পতা। ফলে বেশিরভাগ নদনদীর খাত স্বাভাবিকের তুলনায় উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বন্যার যে পানি নদীখাতেই এঁটে যাওয়ার কথা ছিল, তা উপচে তীরের দিকে ছুটছে এবং দেখা দিয়েছে ভাঙন। কারণ নদীতে জায়গা না হলে তীরে তো ভাঙতেই থাকবে! যেমন তিস্তা নদীতে আমরা দেখি, যত দিন যাচ্ছে ভাঙনের তীব্রতা তত বাড়ছে। অর্থাৎ শুকনো মৌসুমে যখন নদীটি পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, তখন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবার বন্যায় যখন বিপুল প্রবাহ, তখন ভাঙন ছাড়া নদীর আর কোনো 'উপায়' থাকছে না।
দ্বিতীয় কারণ, আমার ধারণা, বালু উত্তোলন। দেশের প্রায় সব নদনদীতে যত্রতত্র, যেনতেনভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। রিভারাইন পিপল থেকে এক চকিত সমীক্ষায় আমরা দেখেছিলাম, করোনায় দেশজুড়ে কার্যত লকডাউন থাকলেও বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল না। কোথাও কোথাও বরং প্রশাসন, পুলিশ ও নদী আন্দোলনকারীদের করোনা নিয়ে ব্যস্ত বা গৃহবন্দি থাকার বিষয়টিকে বালুখেকোরা 'সুযোগ' হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর কুফল এই বন্যায় মিলছে। দেশের কয়েকটি এলাকা থেকে ভুক্তভোগীরা আমাকে জানিয়েছেন, ঠিক যে যে স্থানে বালু তোলা হয়েছে- এবার ঠিক সেখানে সেখানেই দেখা দিয়েছে প্রবল ভাঙন।
বন্যায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি নতুন নয়। কিছু অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সত্ত্বেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের দক্ষতা প্রশংসনীয়। করোনাভাইরাসজনিত কঠিন পরিস্থিতিতে এবার নিশ্চয়ই আরও দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে থাকতে হবে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি। কিন্তু এবারের অন্যরকম বন্যার চরিত্র ও কারণ সম্পর্কে আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি ভিন্নভাবে ভাবতে না পারেন, তাহলে সামনের দিনগুলো হয়ে উঠবে আরও কঠিন।
আমরা যদি নদনদীতে নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারি; আমরা যদি নির্বিচার বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি; এবারের বন্যায় যে নদী ভাঙনের প্রাবল্য, তা বছর বছর বাড়তেই থাকবে। দীর্ঘায়িত হতে থাকবে নদী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের মিছিল।
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
[email protected]