দুর্বৃত্তরা আওয়ামী লীগ গিলে খাবে?
আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি আর বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যে দলটির যাত্রা ১৯৪৯ সালে শুরু, সে দলটির কীর্তি অম্লান হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলা নামের একটি দেশ সৃষ্টি, ইতিহাসের সব বাঁকেই আওয়ামী লীগের সরব উপস্থিতি। আওয়ামী লীগ এমন একটি দল, যে দল অনেক প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নিষিদ্ধ হয়েছে কয়েকবার, ভেঙেছে একাধিকবার, দলের প্রাণপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন অন্তত দু'বার, তার পরও দলটি ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর দলটির নাম নেওয়া অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল সামরিক শাসক জিয়ার হুকুমে। সেই দলকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে দীর্ঘ একুশ বছর পর, যা সম্ভবত বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ সবই সম্ভব হয়েছে নেতৃত্ব ও দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের কারণে। শেখ হাসিনা এই দফা নিয়ে দেশের চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। এটাও একটি নজিরবিহীন অর্জন।
আওয়ামী লীগকে কখনও হাইব্রিড বা দুর্বৃত্তদের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। সেই আওয়ামী লীগ বর্তমানে হাইব্রিড আর দুর্বৃত্তদের কারণে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে। শেখ হাসিনা ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করছেন দলের সুনাম অটুট রাখার জন্য কিন্তু এদের সঙ্গে পেরে উঠছেন না বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগের প্রথম বড় মাপের ভয়ংকর দুর্বৃত্ত সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের নেতৃত্বদানকারী খন্দকার মোশতাক, যার রাজনৈতিক জীবনকাল অনেকটা বঙ্গবন্ধুর সমান। মোশতাক সব সময় বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী ছিলেন। একবার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- 'বাবা বলতেন আমার কিছু হলে তোমরা মোশতাক চাচার কাছে চলে যাবে।' সেই মোশতাকই ১৯৭৫ সালে ঘাতকদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কারা দলে হাইব্রিড ছিল বা কারা আওয়ামী লীগের নীতি আদর্শে বিশ্বাস না করা সত্ত্বেও দলের বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠ হয়েছিলেন তা বোঝা গিয়েছিল, কারণ তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে রেখে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন।
বর্তমান সময়ে ঐতিহ্যবাহী এই দলটি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচিত হচ্ছে 'হাইব্রিড আওয়ামী লীগার' নামের কিছু অনুপ্রবেশকারী দলীয় নেতাকর্মীর কারণে যারা বঙ্গবন্ধু ও দলের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত, যা আওয়ামী লীগের কখনও প্রাপ্য ছিল না। সর্বশেষ ঘটনা বাটপার মো. সাহেদ করিম কাণ্ড, যিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা করেননি। এদেশের মানুষ অতীতে অনেক দুর্বৃত্ত দেখেছে; কিন্তু সাহেদের মতো এত দুঃসাহসী রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত আর টাউট কখনও দেখেনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে যেসব অপকর্ম করেছেন, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। নিজেকে আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বেসরকারি টিভিতে অর্থের বিনিময়ে টকশোতে অংশগ্রহণ করেছেন, যা অন্তত আমার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি এটি কোনো কোনো টক শো প্রযোজকের বেলায় সত্য। সব সংরক্ষিত স্থানে সাহেদের প্রবেশ ছিল অবাধ। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দেওয়া কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ ছিল তার কাছে নস্যি। একটি ছবিতে দেখা গেছে- কোনো এক স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে ছাত্রদের সালাম গ্রহণ করছেন। সঙ্গে স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক ভ্যালিতে যাওয়ার পথে তাকে পুলিশ সামনে-পেছনে প্রটোকল দিচ্ছে। সেনাকুঞ্জে সেনাপ্রধানসহ আইজি, মন্ত্রিসভার সদস্য- সবার সঙ্গে মোলাকাতের ছবি তুলে তা ফেসবুকে শেয়ার করে সাহেদ তার গুরুত্ব জাহির করার কাজে বেশ সফল হয়েছেন। লেখাপড়ার দৌড় এসএসসি। সেই বিদ্যা নিয়ে নিজেকে সেনাবাহিনীর কর্নেল, মেজর, প্রধানমন্ত্রীর এডিসি পরিচয় দিতে দ্বিধা করেননি। সাহেদ বলে বেড়াতেন, তিনি গণভবনে অফিস করেন।
উত্তরা ও মিরপুরে 'রিজেন্ট হাসপাতাল' নামের দুটি সাইনবোর্ড-সর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে হাসপাতাল পরিচয় দিয়ে কভিড-১৯ ভুয়া সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন নির্দি্বধায়। এই প্রতারণা করার সুযোগ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রিজেন্ট হাসপাতালকে সনদ দেওয়ার কাজে অনুমতির সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। পরে সাহেদের জালিয়াতি ফাঁস হয়ে গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, তারা ওপরের নির্দেশে এই কাজ করেছেন। মানুষ জানতে চায়- এই ওপরের নির্দেশদাতা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এমন জনবিরোধী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? শেষতক র্যাবের হাতে রিজেন্টের কুকীর্তি ধরা পড়ার পর সাহেদের সব অপকর্ম ফাঁস হতে শুরু করে। জানা গেল একসময় তিনি হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ ছিলেন। প্রশাসন রিজেন্ট হাসপাতাল সিল করে দিলেও সাহেদ ঠিকই গা ঢাকা দিয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন বা থাকতে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ এটি বিশ্বাস করে না- সাহেদ কোথায় আছেন তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানে না। তারা মনে করে, একদিন দেখা যাবে সাহেদ একটি বিশেষ বিমান চার্টার করে দেশ ত্যাগ করে অন্য কোনো দেশে উদয় হয়েছেন।
সাহেদ ছাড়াও এমন সব জাল-জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জেকেজির ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ। তারা তো কভিডের জাল সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য রীতিমতো মহাখালীতে খোলা মাঠে দোকান খুলে বসেছিলেন। এই জালিয়াতি করে এই দম্পতি কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের অপকর্মও র্যাবের হাতে ধরা পড়ে এবং দু'জনকেই আটক করা হয়। রিজেন্ট বা জেকেজির মতো প্রতিষ্ঠানের জাল সার্টিফিকেট নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়া শ' দুয়েক বাংলাদেশিকে দেশে শুধু ফেরতই পাঠায়নি, সে দেশের সরকার ইতালির সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান যোগাযোগ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। এর আগে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাহেদের মতো দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বাংলাদেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার কর্মকাণ্ডে শামিল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এসব দুর্বৃত্তকে আওয়ামী লীগ বা সরকারের এত ঘনিষ্ঠ হাওয়ার সুযোগ করে দিল কারা? নিশ্চয়ই দলের ভেতরের কেউ। খুঁটির জোর না থাকলে এসব দুর্বৃত্ত এত দুঃসাহসী হতে পারে না, এতদূর আসতেও পারে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে সাহেদের একটি ছবি দেখে অনেকে আতঙ্কিত। স্বাভাবিকভাবে তারা প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে।
এর আগে সংসদ সদস্য পাপুল কুয়েতে মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে সে দেশে গ্রেপ্তার হয়ে বাংলাদেশের সুনামের বড় ধরনের ক্ষতি করেছেন। কিছুদিন আগে নরসিংদী মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পাপিয়াকে আটক করা হয়। পাঁচ তারকা হোটেলে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য 'হেরেম' খুলে ভালোই ব্যবসা করছিলেন। বাদ সাধল র্যাব। র্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর তার সাম্রাজ্যের পতন হয়; কিন্তু ক্ষতি হয় দলের সুনামের। যে দলটি অনেক ঝড়-ঝাপটা সামাল দিয়েছে, যে দলটি তার দীর্ঘ বাহাত্তর বছরের ইতিহাসে অনেক উত্থান-পতন দেখেছে, যার নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দলের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিজের জীবন দিয়েছেন। দীর্ঘ ছয় বছর দেশান্তরে থেকে তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে দলের হাল ধরে দীর্ঘ একুশ বছর পর দলকে ক্ষমতায় এনেছেন, একাধিকবার নিজের জীবননাশের মুখোমুখি হয়েছেন, রাষ্ট্রের অনেক দুর্যোগ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন; কিন্তু তার সব অর্জন ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে সাহেদ আর পাপিয়াদের মতো কিছু দুর্বৃত্ত, যাদের সহায়তা দেন দলের অভ্যন্তরে থাকা ও সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তি। তা যদি না হয় তাহলে এরা এত বেপরোয়া হয় কীভাবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একটি বিনীত অনুরোধ- পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আগে আপনি শক্ত হাতে এসব দুর্বৃত্তের লাগাম টেনে ধরুন, না হয় আগামীতে বিপদ অনিবার্য। এসব মানুষ আপনার সব অর্জন ম্লান করে দেওয়ার জন্য ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করছে। আপনিই একমাত্র ব্যক্তি এদের কবল থেকে আওয়ামী লীগকে উদ্ধার করতে পারেন। সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্নেষক ও গবেষক
- বিষয় :
- রাজনীতি