ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

সংস্কৃতি

এন্ড্রু কিশোর ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র

এন্ড্রু কিশোর ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র
×

রাজীব সরকার

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০ | ১৪:২৬

স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয়তম কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর পিঞ্জর ভেঙে ডানা মেলে অচেনা পথের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছেন। যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তার জীবনাবসানের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সহশিল্পী, সঙ্গীতবোদ্ধা, ভক্ত-অনুরাগীরা দেশে-বিদেশে শোকার্ত। তার অপরিমেয় গানের সংখ্যা, আটবার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি, 'প্লেব্যাক সম্‌্রাট' উপাধি লাভ ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে। সেদিকে পুনরাবৃত্তি না করে অন্য একটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই বর্তমান লেখায়।

কোনো সন্দেহ নেই গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একটি দুঃসময় অতিক্রম করছে। এই দুঃসময়ের অন্যতম উদাহরণ- প্রায় দেড় হাজার প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমতে কমতে এখন আড়াইশ'তে দাঁড়িয়েছে। জেলা শহরগুলোর সিনেমা হল ভেঙে তৈরি করা হচ্ছে শপিংমল। রাজধানীকেন্দ্রিক সিনেপ্লেক্সগুলোতে কালেভদ্রে দু-একটি ছবি দেখার জন্য দর্শকের ভিড় জমে। এ ছাড়া সমগ্র দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, এদেশের চলচ্চিত্র শিল্প নিদারুণ রক্তশূন্যতায় ভুগছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের বলিউড ও টলিউড যখন ফুলে-ফেঁপে উঠছে, তখন ঢালিউডের এই রুগ্‌ণ দশা চলচ্চিত্রের বিপর্যয়কেই তুলে ধরে। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে সংগীত বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চলচ্চিত্রের কাহিনি ও কলাকুশলীদের অভিনয় দুর্বল; কিন্তু গানের বদৌলতে চলচ্চিত্র সুপারহিট হয়েছে এমন উদাহরণ প্রচুর দেওয়া যাবে। প্লেব্যাক শিল্পীরা এভাবে তারকা খ্যাতি অর্জন করেছেন। উপমহাদেশের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় শিল্পীদের গানের একটি বড় অংশ চলচ্চিত্রের গান। কিংবদন্তি শিল্পী মুকেশ, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, হেমন্ত, লতা, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে, অনুরাধা পাডোয়াল, কুমার শানু, উদিত নারায়ণ, অলকা ইয়াগনিক এমনকি হালের শ্রেয়া ঘোষাল, অরিজিৎ সিংয়ের জনপ্রিয়তার মূল উৎস চলচ্চিত্রের গান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

পঞ্চাশের দশকে আমাদের চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর বেশ কয়েকজন প্লেব্যাক শিল্পী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। মাহমুদুন্নবী, ফেরদৌসী রহমান, আব্দুল জব্বার, বশীর আহমেদ, খুরশীদ আলম, সৈয়দ আব্দুল হাদী, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সুবীর নন্দী অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন আমাদের চলচ্চিত্রে। প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তায় তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন এন্ড্রু কিশোর। বিভিন্ন মাধ্যমে গান গাইলেও তার প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয়তার উৎস চলচ্চিত্রের গান।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে এদেশের চলচ্চিত্র ও এন্ড্রু কিশোরের গান হয়ে উঠেছিল পরস্পরের পরিপূরক। এক্ষেত্রে বলে রাখি- গান যদিও গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর যৌথ সৃজন, তবুও আমাদের মতো দেশে গানের সাফল্যের শিরোপা পান শিল্পী। গীতিকার ও সুরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান। এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুর পরও ওই দৃশ্যই দেখা গেল। বিভিন্ন কালজয়ী গানের কথা উল্লেখের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও আলোচনায় নেই সেই সব অবিস্মরণীয় গানের গীতিকার বা সুরস্রষ্টার নাম। কোনো সন্দেহ নেই গুণী গীতিকার ও সুরস্রষ্টাদের সঙ্গে মিলেই জনপ্রিয়তার চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন এন্ড্রু কিশোর। তার গান জনপ্রিয় হওয়ার মানে ছিল সেই চলচ্চিত্রের হিট হওয়া। কয়েক প্রজন্মের অভিনেতা জনপ্রিয় হয়েছেন তার গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে।

আশির দশকে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত জীবনে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল রেডিও। এন্ড্রু কিশোরের দরাজ, ভরাট ও পৌরুষদীপ্ত গায়কি মুহূর্তেই আর্কষণ করত শ্রোতার মন। সেই মন নিরক্ষর কুলির হোক বা উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর কিংবা প্রাজ্ঞ-প্রবীণের। এন্ড্রু কিশোরের জনপ্রিয়তা এভাবেই হয়ে উঠেছিল সর্বত্রগামী। এমনকি বাংলা চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে নাসিকাকুঞ্চন করতে অভ্যস্ত যে শ্রেণি সেই শ্রেণিও এন্ড্রু কিশোরের অসামান্য প্রতিভাকে অস্বীকার করতে পারেনি। তার বেশ কিছু অবিস্মরণীয় গানের গীতিকার সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে কয়েকটি গান লিখে তিনি তুলে দিয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোরের হাতে।

নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন সহজলভ্য হলো। রেডিও তো বটেই, টিভির 'ছায়াছন্দ' অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও এন্ড্রু কিশোরের গান আরও আদরণীয় হয়ে উঠল। শুধু তার গানের কারণে কোনো কোনো মানহীন চলচ্চিত্র দর্শক বারবার দেখেছে। এভাবে বহু চলচ্চিত্র 'দর্শক রুচির বৈতরণী' পার হয়ে গেছে তার গানের সাফল্যে। নব্বইয়ের দশকের শেষ প্রান্তে বাংলা চলচ্চিত্রে যখন অশ্নীলতার যুগ শুরু হলো, তখন চলচ্চিত্র সংশ্নিষ্ট গুণী মানুষেরা একে একে বিদায় নিলেন এই শিল্প থেকে। এন্ড্রু কিশোরেরও গানের সংখ্যা কমে যেতে লাগল চলচ্চিত্রে। এটি মোটেও কাকতালীয় নয় যে, আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিপর্যয় এবং এন্ড্রু কিশোরের ক্যারিয়ারের অবসান সমান্তরাল ভাবে ঘটেছে। দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সাফল্য ও তার জনপ্রিয়তা ছিল সমার্থক।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের চিত্রটি ভিন্ন। ভারতের সবচেয়ে সফল প্লেব্যাকশিল্পী কিশোর কুমারের জীবনাবসান ঘটে ১৯৮৭ সালে আটান্ন বছর বয়সে। জীবন সায়াহ্নেও তিনি অসাধারণ কিছু গান গেয়েছেন বাংলা ও হিন্দি দুই ভাষাতে। এটি সম্ভব হয়েছে সেই দেশের 'স্বাস্থ্যবান' চলচ্চিত্র শিল্পের কারণে। আশি বছর বয়সে পৌঁছেও লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে অষ্টাদশী নায়িকার জন্য কণ্ঠ দিয়েছেন গানে। সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লা গত এক দশকে তাদের প্রতিভার উপযুক্ত কয়টি গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন? এন্ড্রু কিশোর পঁয়ষট্টি বছর বেঁচে ছিলেন। তার স্বল্প আয়ুটুকুরও সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি। এর দায় মূলত এদেশের রুগ্‌ণ চলচ্চিত্র শিল্পের। এন্ড্রু কিশোরের শূন্যস্থান কখনও পূরণ হবে না- এমন মতামত দিয়েছেন অনেক সংগীতবোদ্ধা। এন্ড্রু কিশোর কেন তার অর্ধেক মানের প্লেব্যাক শিল্পীও তৈরি হবেন না যদি আমাদের চলচ্চিত্রের সুদিন না ফেরে।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×