সমকালীন প্রসঙ্গ
সীমিত নয় বরং সতর্ক কোরবানি
মো. শফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০ | ১৪:২৬
করোনায় কোরবানি এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষকে সম্ভবত এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। কোরবানি ঈদ আমাদের জন্য সব সময়ই অনেক আনন্দ আর কর্মময় হয়ে থাকে। সবাই মিলে পশুর হাটে গিয়ে গরু, খাসি এবং অন্যান্য পশু ক্রয় করে কোরবানির প্রস্তুতি নিতে থাকি জোরেশোরে। কিন্তু এ বছর আমরা হাটেই যেতে ভয় পাচ্ছি করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায়।
কোরবানির সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। কোরবানির যে বিলি-বণ্টন রেওয়াজ রয়েছে তাতে এক-তৃতীয়াংশ গরিব-দুস্থ মানুষের এবং এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনের। বাকি একাংশ নিজের পরিবারের। অনেক মানুষ সাধারণত তার নিজস্ব গ্রামে কোরবানি দিতে চান। কারণ তাতে গ্রামের গরিব-দুস্থ মানুষ খুশি হন এবং তারা অংশগ্রহণ করতে পারেন। এবার করোনা ঝুঁকির কারণে অনেকেই যদি সিদ্ধান্ত নেন যে কোরবানি দেবেন না, তাহলে তো নিশ্চিতভাবে বলা যায় গরিব বা অসহায় মানুষ যারা সচরাচর গোশত খেতে পারেন না, তারা বঞ্চিত হবেন। যাদের সামর্থ্য ও আগ্রহ রয়েছে, তারা যেন অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে কোরাবানির ওয়াজিব আদায় করেন। তিন দিন কোরবানি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন দিনে কোরবানি দেওয়ার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা কমে যাবে।
এ বছর অনলাইনে কোরবানির পশুর হাট ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয় পক্ষ স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য অনলাইনে পশু কেনাবেচায় বেশ আগ্রহী। লেনদেন অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে, এটা ইতিবাচক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, করোনাকালের কোরবানিতে পশু কেনা থেকে শুরু করে পশু জবাই, গোশত বিলি এবং গোশত সংরক্ষণ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। তাই এবার কোরবানিতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। সরকারি দিকনির্দেশনা যেমন এক্ষেত্রে খুবই জরুরি, তেমনি নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খুবই তৎপর থাকতে হবে যাতে কেউ স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করতে না পারে। যদিও ঢাকায় শুরুতে কোরবানির হাট বসার কথা ছিল না, পরে শুনতে পাচ্ছি কিছু স্থানে হাট বসবে। কভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে এবার পশুর হাট বসছে। তাই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে হাটে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বাড়তি সতর্কতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া একান্ত জরুরি। যাতে সবাই মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। অন্যথায় কোরবানি হাটের মিথস্ট্ক্রিয়া করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
পশুর হাটের পাশে চা-শিঙাড়ার দোকানসহ আড্ডাস্থলগুলো বন্ধ রাখা ভালো। জবাই করার আগে পশুটিকে ভালোভাবে গোসল করাতে হবে। পশু জবাই করার সময় খুব কম লোক নিয়ে পশুর গোশত প্রসেস করতে হবে এবং যাদের দিয়ে এসব কাজ করানো হবে তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে, তাদের করোনা বা করোনার লক্ষণ নেই। যদি সম্ভব হয় লোক ভাড়া না করে কোরবানির পশু নিজেরা প্রসেস করতে পারলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। গরিবদের মধ্যে গোশত বণ্টন করার সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরে-সুস্থে সামাজিক দূরত্ব অনুসরণ করে প্যাকেটের মাধ্যমে এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। প্যাকেট কিনে গোশত প্যাকিং করার আগে প্যাকেট জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। কেউ যদি গোশত ফ্রিজে রাখতে চান সেখানেও সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
যদিও অনেকে বলছেন 'সীমিত আকারে' কোরবানি করতে। তবে আমি মনে করি, সম্ভাব্য সবাই কোরবানি দিক। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। কারণ কোরবানির ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। আর মহামারিতে কোনোভাবেই এই আর্থিক ক্ষতি করা যাবে না। বিশেষ করে ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধের পর দেশি পশু কোরবানির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে কোরবানিকে উদ্দেশ করে গরু পালন এবং তা বিক্রির বিশাল একটি গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আছে চামড়া শিল্প। কোরবানির সময়ই দেশের ৮০ ভাগ পশুর চামড়া পাওয়া যায়। তাই অনলাইনে হোক বা মাঠপর্যায়ে, কঠোর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কোরবানির পশুর হাট এবং সার্বিক কোরবানিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে হবে। কোরবানিতে চামড়ার যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা যেভাবে হোক কাজে লাগাতে হবে।
এখন চামড়া রপ্তানি বন্ধ আছে। চামড়াজাত পণ্যের চাহিদাও কমে গেছে। তাই কোরবানির চামড়া নিয়ে সংকট হতে পারে। এ ছাড়াও চামড়া সংগ্রহ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, চামড়ার বড় একটি অংশ সংগ্রহ করেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তারা করোনার কারণে চামড়া কিনতে তেমন উৎসাহিত হবেন বলে মনে হচ্ছে না। গত বছরের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার চামড়া অব্যবহূত রয়ে গেছে এখনও। সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে চামড়ার মজুদে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। চামড়া বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হলে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা চামড়ার সঠিক মূল্য পাবেন এবং এতিম, মিসকিন, গরিব-দুস্থ মানুষ উপকৃত হবেন।
অনেক গ্রামে সবাই এক জায়গায় পশু জবাই করেন। তা না করে নিজেদের বাড়িতে জবাই করলে সমাগম কম হবে। যার যার এলাকায় যেখানে হাট বসে, সেখান থেকে পশু কিনতে হবে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে হবে বা একেবারে বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। গত রোজার ঈদের ছুটিতে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ অনেক বেড়েছিল। তাই এবার বিষয়টি কম গুরুত্ব দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। তার পরও যারা শহর থেকে গ্রামে যাবেন, তাদের কিছু বাড়তি চিকিৎসা সামগ্রী যেমন অক্সিমিটার সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ভালো।
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- মো. শফিকুল ইসলাম