মুখোমুখি অবাধ্য সত্য
'রি-অ্যাকটিভ' নয়, চাই 'প্রো-অ্যাকটিভ' পুলিশ
ড. জিয়া রহমান
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৫:১০
আমার নানা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আমরা পারিবারিকভাবে যে কোচে করে ফরিদপুর শহরে নানার বাড়িতে যেতাম সে কোচ আমাদের একেবারেই নানার বাড়ির উঠানে নামিয়ে দিত। নানা পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বলে তার আত্মীয়-স্বজনও এই সুবিধা পেতেন। নানাবিধ কারণে ছোটবেলায় আমরা পুলিশ সম্বন্ধে বিভিন্ন কথা শুনতাম। উপমহাদেশের পুলিশ বরাবরই ছিল অসীম ক্ষমতাধর একটি প্রতিষ্ঠান- যার প্রমাণ পেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন একটি ঘটনায় পুলিশের সেবা নিতে থানায় গিয়ে। ব্রিটিশ শাসনামলে পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও আমাদের দেশে পুলিশ একটি ফোর্স হিসেবেই রয়ে গেছে নানা কারণে।
গত ৩১ জুলাই পবিত্র ঈদুল আজহার আগের রাতে টেকনাফ থানার বাহারছড়া পুলিশ ক্যাম্পে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে উপর্যুপরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গুলি করার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, যদি বলা হতো ভুল বোঝাবুঝির কারণে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে তাতেও কিছুটা আস্থা থাকত। কিন্তু আমরা সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি, হত্যার পর বিভিন্ন গল্প সাজিয়ে মেজর (অব.) সিনহার ব্যক্তিগত চরিত্রে দাগ লাগানোর চেষ্টা করেছেন ওসি প্রদীপ। ঘটনার পর বিলম্ব না করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ওসি প্রদীপসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, তদন্তের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানের নামে টেকনাফ এলাকায় বেশ কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে জনগণের অভিযোগ এমন যে, সত্যিকার মাদক কারবারিদের আড়াল করতে ওসি প্রদীপ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতেন। ফলে পুলিশি সেবা নিতে থানায় যাওয়া মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করত।
পুলিশের ভেতর নানা অসঙ্গতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা আছে বলেই বিভিন্ন সময় সমালোচিত হচ্ছে সংস্থাটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একটি বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে। আমরা জানি ১৮৬১ সালের বেঙ্গল পুলিশ অ্যাক্টেই এখন পর্যন্ত চলছে বাংলাদেশ পুলিশ। জনগণের মধ্যে যেন কখনও সরকারবিরোধী মনোভাব গড়ে না ওঠে এবং জনগণের যে কোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলন যেন প্রতিহত করা যায়, এটাই ছিল ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের মূল উদ্দেশ্য। পাকিস্তান আমলেও আমরা দেখেছি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফার আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনসহ জনগণের সব আন্দোলন প্রতিহত করতে সরকার পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করেছে দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে। ফলে পুলিশ কখনও জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে ১৮৬১ সালের আইনে পুলিশকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে ১৮৬১ সালের আইনেও কিন্তু পুলিশকে অবাধে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
পুলিশ বাহিনীর সংস্কার প্রস্তাব অনেকবার এলেও তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে; কখনও আলোর মুখ দেখেনি। উন্নত বিশ্বে যেখানে পুলিশকে 'পুলিশ অ্যাজ সার্ভিস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ পুলিশ 'পুলিশ অ্যাজ ফোর্স' স্বীকৃতি বহন করে চলেছে। ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর ধারাবাহিকভাবে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার পর অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। পুলিশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের কেউই পুলিশের সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করেনি। এটি আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে ২১ বছরের অগণতান্ত্রিক শাসনের কারণে। অগণতান্ত্রিক শাসকরা একটি সনাতনী প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের পরিবর্তে ধ্বংসই করেছে- ইতিহাস এমন সাক্ষ্যই দেয়। উন্নত বিশ্বে পুলিশের যে জবাবদিহি রয়েছে, আমাদের দেশে তা একেবারে নেই বললেই চলে। এখানে সরকার, অর্থনৈতিক এলিট, সামাজিক এলিট ও রাজনৈতিক এলিটদের সঙ্গে পুলিশের অশুভ আঁতাত থাকে। এর সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনীতিকীকরণ পুলিশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে পুলিশের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া দুস্কর।
মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও সেনা দুই বাহিনীর প্রধান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অপরাধের দায় ব্যক্তির বলে জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, এ ঘটনা দুই বাহিনীর আন্তঃসম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আমরা এ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাই। আমরা জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতা দেখেছি। পুলিশের মানবিক রূপ দেখেছি অতি সম্প্রতি কভিড-১৯ মোকাবিলার ক্ষেত্রে। করোনাকালে মানবিক সেবা দিয়ে সবার মনে ভালোবাসা ও আস্থার জায়গা তৈরি করেছে পুলিশ। ১৯৭১ সালে পুলিশের যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় তাও আমরা জানি। এ ছাড়া পুলিশের উচ্চস্তরে যারা আছেন তাদের প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা ও নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। কাজেই ঢালাওভাবে যে পুলিশের সমালোচনা করছি তা কিন্তু নয়, আমরা বলছি কাঠামোগত সংস্কার বা উন্নয়ন না হওয়ার ফলেই মূলত এ ঘটনাগুলো ঘটছে।
বর্তমানে আধুনিকায়ন ও বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুলিশ কাঠামোর ব্যাপক সংস্কারই পারে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। একই সঙ্গে উপযুক্ত শাস্তি বিধানের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, আমরা জানি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি বড় বৈশিষ্ট্য। দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি বিধানের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পুলিশের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে তেমনি জনগণের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যায়।
আধুনিক পুলিশ গড়ার জন্য পাশ্চাত্যে কমিউনিটি পুলিশ ধারণা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে 'ক্রাইম প্রিভেনশন' নিশ্চিত করা হয়। একটি ঘটনা ঘটার পর তার পেছনে ছুটে সমস্ত রিসোর্স মবিলাইজ করে কেবল 'রি-অ্যাকটিভ' পুলিশের খেতাব নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে; এর থেকে উত্তরণে 'প্রো-অ্যাকটিভ' পুলিশিংয়ের কোনোই বিকল্প নেই। এর অর্থ হলো যে কোনো অপরাধ যাতে সংঘটিত না হতে পারে সেভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আমরা মনে করি, মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদের ঘটনাটিকে একটি 'কেস' হিসেবে বিবেচনায় এনে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে আগাম পরিকল্পনা থাকবে।
সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- মুখোমুখি অবাধ্য সত্য
- ড. জিয়া রহমান
