স্মরণ
মৃত্যুঞ্জয়ী চট্টলবীর
মোহাম্মদ বেলাল হোসেন
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:২৪
নেতৃত্বের অন্যতম গুণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন। বীরত্ব, ত্যাগ ও কর্মগুণে জনমানুষের অন্তরে স্থান করে নেওয়ার মাধ্যমেই ভালোবাসা অর্জন করা যায়। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন নেতা পরিণত হন গণমানুষের নেতায়। চট্টগ্রামের গণমানুষের নেতা ছিলেন চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের জন্য সবটুকু উজাড় করে দিতে সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন তিনি। তিন মেয়াদে মোট ১৭ বছর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। চট্টগ্রামবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতির জন্য কাজ করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুরো নাম আবুল বশর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নেতৃত্ব দেন মহানগর ছাত্রলীগের। '৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, '৬৬-র ছয় দফা আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন সক্রিয়ভাবে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। নেভাল বেইস টর্চার ক্যাম্পে ধারাবাহিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে পাগলের অভিনয় করে কারাগার থেকে বের হয়ে চলে যান ভারতে। হরিনা ইয়ুথ ক্যাম্পে পৌঁছে দেখেন তার নামেই সেখানে করা হয়েছে 'শহীদ মহিউদ্দিন ব্যারাক'। সহকর্মীরা মনে করেছিলেন তিনি শহীদ হয়েছেন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। ভারতের উত্তর প্রদেশের তান্দুয়া কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ শেষে 'মাউন্ট ব্যাটালিয়নে'র প্লাটুন কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন। পরে বিএলএফের মিডল ও সাউথ কলামের কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি। পার্বত্য এলাকায় তিনশ মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতা হিসেবে সম্মুখসমরে নেতৃত্ব দেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সহযোদ্ধাদের নিয়ে বিজয়ীর বেশে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
স্বাধীন দেশে শ্রমিক ও যুব রাজনীতির প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৭৩ সালে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে বার্লিনে বিশ্ব যুব কংগ্রেসে যোগ দেন। শহীদ মৌলভী সৈয়দের সঙ্গে আওয়ামী যুবলীগ নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে পুরো দেশে নিস্তব্ধ-নীরবতা নেমে আসে। ওই সময় সামরিক সরকার মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করে 'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা'। রাজনৈতিক হুলিয়ার কারণে কলকাতায় ফেরারি হন তিনি। সেখানে কখনও হোটেলবয়, কখনও শিয়ালদহ রেলস্টেশনে পত্রিকা বিক্রি করে দিনাতিপাত করেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একটানা ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। আপন হাতে ঢেলে সাজিয়েছেন নগরের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের 'সেবক' উপাধি দিয়ে নতুন পরিচয় দান করেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্কুল ও কলেজগুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়নে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে পদক্ষেপ নেন।
চট্টগ্রামের স্বার্থের প্রশ্নে মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন আপসহীন। আমেরিকার এসএসএ কোম্পানি ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোহনায় পোর্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিলে মহিউদ্দিন চৌধুরী তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে তা বন্ধ করে দেন। একইভাবে বছরে মাত্র ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে শাহ আমানত বিমানবন্দর থাই কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে গর্জে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি আন্দোলন করেছিলেন- 'কর্ণফুলী নদীতে টানেল চাই।' আজ কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের কাজ শেষ পর্যায়ে।
সমাজ ও রাজনীতিতে সবাই নেতা বা নায়কের স্থান করে নিতে পারেন না। ইতিহাসে নায়ক হওয়ার মতো মানুষ সব কালে, সব যুগে সৃষ্টি হয় না। ইতিহাস আপন তাগিদে নায়কের উদ্ভব ঘটায়। চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী তেমনি এক অবিসংবাদিত নেতা, যার সৃষ্টি ইতিহাসের প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। হাজার বছর পরে যখন চট্টগ্রামের সমৃদ্ধির ইতিহাস লেখা হবে, তখন লেখকদের ফুটনোটে উচ্চারিত হবে চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম।
ইতিহাসবিষয়ক গবেষণাকর্মী
[email protected]