নীলা একজন নন, অনেক
জয়শ্রী দাস
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২০ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৪:৪২
'কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ'- এই প্রবাদটির সঙ্গে আমাদের সমাজে অনেক কিছুর অমিল খুঁজে পাওয়া ভার। প্রতিবছর প্রকৃতির নিয়ম মেনে শীত আসে আবার চলেও যায়, কিন্তু শীতকালে আমাদের দেশের দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষই হয় না। প্রতিবছরই কমবেশি এ চিত্র দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। এবারও এরই মধ্যে শীতের তীব্রতা কোনো কোনো অঞ্চলে প্রকট হয়ে উঠেছে।
গত ১২ ডিসেম্বর সমকালে 'শীত নিবারণের কাপড় নেই নীলা কয়ালের' শিরোনামের প্রতিবেদনটি চোখ আটকে গেল। বৃদ্ধা নীলার শরীরে শীত নিবারণের মতো কাপড় নেই। ঠান্ডা বাতাসে কাঁপছিলেন নীলা কয়াল। তিনি বলেছেন, 'এই একখান কাপড় আছে। রাত্তির বেলা এই কাপড়ের পরে খ্যাতা (কাঁথা) পেঁচায়ে শুয়ি থাকি। শীত লাগলিও উপায় তো আর নেই। এই পাতা জ্বালায়ে বাড়িত রান্ধা-বাড়ার সঙ্গে আমাগের শীত নিবারণও হবে।' বৃদ্ধ কাদের শেখ ও বৃদ্ধা নাদিরা খাতুনের কথাগুলোও যে কোনো শুভবোধসম্পন্ন মানুষকে বেদনকাতর করবে। আমাদের চারপাশে অনেক নীলা, কাদের, নাদিরার মতো মানুষ শীতে দুর্ভোগে পড়েন। শীতের সঙ্গে লড়াই করেন। ক'জনের মধ্যে তাদের জন্য সহানুভূতি জাগে- এ প্রশ্নটা নতুন নয়। দিন দিন আমরা অনেকেই বড় স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছি ঠিকই কিন্তু অনেকেই কৃপণতার দিকেও ধাবিত হচ্ছি। যাদের সামর্থ্য-সঙ্গতি আছে তাদের অনেকেই সামাজিক-মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন না। সমাজে মানবিক মানুষের সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।
শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র দানের মাধ্যমে কোনো কোনো মানুষ দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটান বটে কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তা দেখা যায় না। আমরা যদি আগে নিজেরা মানবিক মানুষ হই এবং অন্যকে মানবিক হতে উৎসাহিত করি তাহলে পাল্টে যাবে সমাজচিত্র। নীলা কয়ালের মতো গরিব-দুঃখী মানুষের খোঁজখবর রাখেন ক'জন। অথচ এসব মানুষ আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার নূ্যনতম মৌলিক অধিকার তাদেরও ন্যায্য প্রাপ্য। শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। এত উন্নয়ন-অগ্রগতি সত্ত্বেও সমাজে এমন নীলা একজন নন, এখনও অনেক। তাদের ভাগ্যোন্নয়ন না ঘটাতে পারলে উন্নয়ন-অগ্রগতি সমীকরণ এত সহজভাবে করা যাবে না। শৈত্যপ্রবাহের আগে যদি তাদের শীতবস্ত্র দেওয়া যেত তাহলে নীলা কয়ালরা তীব্র শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতেন। তাহলে হয়তো তাদের এমন দুর্দশার চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসত না। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার শীতের তীব্রতা আরও বাড়বে। অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষের শীত মোকাবিলা এখনই খুব কঠিন হয়ে উঠেছে। ঠান্ডাজনিত নানা অসুখে কাবু বৃদ্ধ ও শিশুরা।
করোনার প্রকোপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাহলে নীলা কয়ালদের কী হবে? দরিদ্র কিংবা হতদরিদ্রদের ক্ষুধা নিবারণই যেখানে কষ্টসাধ্য সেখানে শীতবস্ত্র তো অনেক দূরের কথা। নীলা কয়াল একজন খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। আমাদের সমাজে যাদের অনেক আছে তাদের একটু সহানুভূতি শীতের প্রকোপ থেকে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলোকে রক্ষা করতে পারে। আসুন মানবিক মূল্যবোধ থেকে সবাই ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র নিয়ে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়াই। নীলা কয়ালদের দুর্দশা-দুর্ভোগও যদি সচ্ছল-সামর্থ্যবানদের মানবিক করে তুলতে বিবেককে ধাক্কা না দেয় তাহলে এ রকম চিত্র দেখতেই হবে। আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়ন-অগ্রগতি হয়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে কিন্তু নীলা কয়ালের মতো এখনও অনেকেই রয়ে গেছেন দায়িত্বশীলদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। মানবিক তাগিদে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
গবেষক
- বিষয় :
- জয়শ্রী দাস
- নীলা
