স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিলেন
×
স্যার ফজলে হাসান আবেদ, (১৯৩৬-২০১৯)
আহসান এইচ মনসুর
প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০
২০১৭ সালে একটি ফোন কল পেয়েছিলাম। কলটি করেছিলেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ কেসিএমজি। সেদিন তিনি আমাকে ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করলেন। বেশ অবাক হয়েছিলাম তার অনুরোধে।
পেশাগত কারণে ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আমার জীবনের বেশ বড় একটা অংশ কেটেছে দেশের বাইরে। স্যার আবেদের সঙ্গে সেভাবে কখনও পরিচয় হয়ে ওঠেনি। মাঝেমধ্যে কিছু অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তখন অনেক বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে তার সঙ্গে। কথা হয়েছে ব্র্যাক ও তার কার্যক্রম নিয়ে। ব্র্যাক ততদিনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমি ভেবে অবাক হতাম, একজন মানুষের স্বপ্ন কীভাবে এত বড় হতে পারে! দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার বিস্তার, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ, ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকীকরণ- কতই না স্বপ্ন তার!
স্যার আবেদ তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিলেন। ব্র্যাকের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল, আড়ং, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ব্যাংক আর বিকাশের মতো বিশ্বমানের সব প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তার সঙ্গে সরাসরি কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগদানের পর তাকে আরও কাছে থেকে দেখেছি। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, অবহেলিত মানুষের সক্ষমতার পেছনে ছুটে চলার এই অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন তার মায়ের কথা। ছোটকাল থেকেই তিনি তার মাকে অসহায়, দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করতে দেখেছেন। সেখান থেকেই মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে তার স্বপ্নযাত্রা। সেদিন বুঝেছিলাম, তার এই বিনয়, মহানুভবতা, একাগ্রতা, গ্রহণযোগ্যতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া- এ সবই ছিল তার পরিবারের কাছ থেকে শেখা।
ব্যবসার চেয়েও তার কাছে বড় ছিল আর্থিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের (এসএমই) এই পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করাতেও মনোযোগ ছিল তার। তাই ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংককে একটি সর্বাধুনিক, গ্রাহকবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।
মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে তিনি আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠান। সেদিনই জানিয়েছিলেন তার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা। প্রস্তাব দিলেন তার পরবর্তী সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদটি গ্রহণ করার জন্য। আমি আরেকবার অবাক হয়েছিলাম। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ব্র্যাক পরিবারের সঙ্গে কোনো সুদীর্ঘ সম্পর্ক নেই আমার। তবুও আমাকেই কেন এই পদে চাইছেন? উত্তরে বলেছিলেন, 'ব্র্যাক ব্যাংকে আমার পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। আমার বয়স ৮৩- অবসর নেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। আমি মনে করি, ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে অভিজ্ঞ কাউকেই এর নেতৃত্বের ভার তুলে দেওয়া উচিত এবং আমি মনে করি, আপনিই এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।'
তিনি বলেছিলেন, ব্র্যাক ব্যাংককে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ব্যাংকের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে, আর এসএমই খাতে আমাদের কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে। ২০১৮ সালে তখন ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই পোর্টফোলিও ছিল মোট কার্যক্রমের ৪০ শতাংশের মতো; তিনি বলেছিলেন ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে। কভিড মহামারির পরও দেখা গেছে, ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২০-এর ৩০ জুন পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই পোর্টফোলিও গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশের ওপরে। আমি মনে করি, ব্যাংক নিয়ে তার ইচ্ছাগুলোর একটা পূরণ করতে পেরেছি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর যে ট্রানজেকশন সক্ষমতা আর টোটাল পোর্টফোলিও; একটি উন্নয়নশীল দেশের হয়ে সেখানে পৌঁছতে আমাদের প্রয়োজন বেশ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমরা সে পথেই এগোচ্ছি।
স্যার আবেদ ছিলেন আমার দেখা অন্যতম ইতিবাচক মানুষ। তিনি কখনোই আফসোস করে বলতেন না- যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতাম! তিনি সবসময় বলেছেন, 'যতদিন বেঁচেছি, যতটুকু পারি করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে রেখেছি। আমি অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমার বিশ্বাস, আমার উত্তরসূরিরা ব্র্যাক পরিবারের সেই স্বপ্ন উজ্জীবিত রেখে এগিয়ে যাবেন।'
আমার সৌভাগ্য যে, ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি অবসর নেওয়ার পরও তার সান্নিধ্য পেয়েছি। একজন মানুষের সত্যিকারের মানবিকতার দিকগুলোর অনেক কিছুই তার কাছ থেকে শিখেছি। এক বছর হলো তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবে তার আদর্শ বীজ পরিণত হচ্ছে আমাদের মাঝে। তিনিই শিখিয়েছেন প্রত্যেক মানুষের আছে নিজেকে মেলে ধরার অসীম সম্ভাবনা। তাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাকে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, ব্র্যাক পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে তার কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
হ চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ব্যাংক; নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট
পেশাগত কারণে ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আমার জীবনের বেশ বড় একটা অংশ কেটেছে দেশের বাইরে। স্যার আবেদের সঙ্গে সেভাবে কখনও পরিচয় হয়ে ওঠেনি। মাঝেমধ্যে কিছু অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তখন অনেক বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে তার সঙ্গে। কথা হয়েছে ব্র্যাক ও তার কার্যক্রম নিয়ে। ব্র্যাক ততদিনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমি ভেবে অবাক হতাম, একজন মানুষের স্বপ্ন কীভাবে এত বড় হতে পারে! দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার বিস্তার, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ, ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকীকরণ- কতই না স্বপ্ন তার!
স্যার আবেদ তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছিলেন। ব্র্যাকের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল, আড়ং, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ব্যাংক আর বিকাশের মতো বিশ্বমানের সব প্রতিষ্ঠান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তার সঙ্গে সরাসরি কিছু কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগদানের পর তাকে আরও কাছে থেকে দেখেছি। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, অবহেলিত মানুষের সক্ষমতার পেছনে ছুটে চলার এই অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন তার মায়ের কথা। ছোটকাল থেকেই তিনি তার মাকে অসহায়, দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করতে দেখেছেন। সেখান থেকেই মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে তার স্বপ্নযাত্রা। সেদিন বুঝেছিলাম, তার এই বিনয়, মহানুভবতা, একাগ্রতা, গ্রহণযোগ্যতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া- এ সবই ছিল তার পরিবারের কাছ থেকে শেখা।
ব্যবসার চেয়েও তার কাছে বড় ছিল আর্থিক সক্ষমতা গড়ে তোলা। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের (এসএমই) এই পরিষেবায় অন্তর্ভুক্ত করাতেও মনোযোগ ছিল তার। তাই ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংককে একটি সর্বাধুনিক, গ্রাহকবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।
মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে তিনি আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠান। সেদিনই জানিয়েছিলেন তার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা। প্রস্তাব দিলেন তার পরবর্তী সময়ে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদটি গ্রহণ করার জন্য। আমি আরেকবার অবাক হয়েছিলাম। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ব্র্যাক পরিবারের সঙ্গে কোনো সুদীর্ঘ সম্পর্ক নেই আমার। তবুও আমাকেই কেন এই পদে চাইছেন? উত্তরে বলেছিলেন, 'ব্র্যাক ব্যাংকে আমার পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। আমার বয়স ৮৩- অবসর নেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। আমি মনে করি, ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে অভিজ্ঞ কাউকেই এর নেতৃত্বের ভার তুলে দেওয়া উচিত এবং আমি মনে করি, আপনিই এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।'
তিনি বলেছিলেন, ব্র্যাক ব্যাংককে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ব্যাংকের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে, আর এসএমই খাতে আমাদের কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে। ২০১৮ সালে তখন ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই পোর্টফোলিও ছিল মোট কার্যক্রমের ৪০ শতাংশের মতো; তিনি বলেছিলেন ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে। কভিড মহামারির পরও দেখা গেছে, ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২০-এর ৩০ জুন পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই পোর্টফোলিও গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশের ওপরে। আমি মনে করি, ব্যাংক নিয়ে তার ইচ্ছাগুলোর একটা পূরণ করতে পেরেছি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর যে ট্রানজেকশন সক্ষমতা আর টোটাল পোর্টফোলিও; একটি উন্নয়নশীল দেশের হয়ে সেখানে পৌঁছতে আমাদের প্রয়োজন বেশ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমরা সে পথেই এগোচ্ছি।
স্যার আবেদ ছিলেন আমার দেখা অন্যতম ইতিবাচক মানুষ। তিনি কখনোই আফসোস করে বলতেন না- যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতাম! তিনি সবসময় বলেছেন, 'যতদিন বেঁচেছি, যতটুকু পারি করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে রেখেছি। আমি অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমার বিশ্বাস, আমার উত্তরসূরিরা ব্র্যাক পরিবারের সেই স্বপ্ন উজ্জীবিত রেখে এগিয়ে যাবেন।'
আমার সৌভাগ্য যে, ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি অবসর নেওয়ার পরও তার সান্নিধ্য পেয়েছি। একজন মানুষের সত্যিকারের মানবিকতার দিকগুলোর অনেক কিছুই তার কাছ থেকে শিখেছি। এক বছর হলো তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবে তার আদর্শ বীজ পরিণত হচ্ছে আমাদের মাঝে। তিনিই শিখিয়েছেন প্রত্যেক মানুষের আছে নিজেকে মেলে ধরার অসীম সম্ভাবনা। তাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাকে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, ব্র্যাক পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে তার কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
হ চেয়ারম্যান, ব্র্যাক ব্যাংক; নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট
- বিষয় :
- স্যার ফজলে হাসান আবেদ
