ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

ব্রহ্মপুত্রের বুকে চাষাবাদ!

ব্রহ্মপুত্রের বুকে চাষাবাদ!
×

আব্দুল হাই রঞ্জু

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:২০

এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নদ ব্রহ্মপুত্র। তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে হিমালয় পর্বতমালার কৈলাসশৃঙ্গের কাছে জিমা ইয়ংজং হিমবাহে ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি। এরপর ভারতের অরুণাচল ও আসাম সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ব্রহ্মপুত্র। বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে কুড়িগ্রাম জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহে প্রবেশ করেছে। রুদ্র মূর্তিতে বয়ে চলা প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্রের অতীতের চিত্র নিজের চোখে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দরে জন্মসূত্রে আমার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় দেখেছি খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্রের সেই রুদ্র চেহারা। ভয়ে ছোট ছোট নৌকা ব্রহ্মপুত্রে চলাচল করত না। চোখের সামনেই বিস্তীর্ণ ফসলের জমি, বসতবাড়ি, হাটবাজার ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর ভাঙনে ভিটেবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় কত মানুষকে অন্য জেলায় স্থানান্তর হতে হয়েছে! নদীভাঙা সহায়-সম্বলহীন এসব মানুষের কষ্টের শেষ ছিল না। জানা যায়, বেঁচে থাকার লড়াই করা জীবনে নিজের জন্মস্থান ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষ এখন ভালো আছেন।

ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে ভাঙনের মুখে একাধিকবার চিলমারী বন্দরটি স্থানান্তর হয়েছে। সর্বশেষ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে চিলমারী ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দরটি ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে পুরোটাই বিলীন হয়ে যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চিলমারী বন্দরটি রমনা ও থানাহাট ইউনিয়নের থানা মৌজায় স্থাপিত হয়। এখনও সেই স্থানে চিলমারী উপজলা কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পন্ন করছে।

খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্রের সেই যৌবন এখন আর নেই; ক্ষীণকায়ে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকালে নদ ভরাট হলেও ক'দিন পরেই আর তাতে পানি থাকে না। নদ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। নাব্য তো নেই-ই, উল্টো বিশাল চরের সৃষ্টি হয়। মানুষ হেঁটেই অনায়াসে নদ পার হয়। মূলত ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, পদ্মা ও সুরমার উজানে ভারত অংশে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশে প্রতিটি নদীর ভাটি পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে এখন কমবেশি প্রতিটি নদী মরা খালে পরিণত হচ্ছে। তিস্তার ভাটিতে পানির অভাবে নদীর বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেলেও এখন প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্রের মরণদশা। এখন ব্রহ্মপুত্রে চর আর চর। যেদিকে চোখ যায়, শুধু বালু আর বালু। এখন নদচাষিরা ব্রহ্মপুত্রের বুকে নানা জাতের ফল-ফসল চাষাবাদ করছে। দেখলে মনে হয়, নদ নয়, যেন ফসলের কোনো সবুজ মাঠ। সরকার ব্রহ্মপুত্রের ঐতিহ্য ফেরাতে এরই মধ্যে খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যমুনার মুখ থেকে কুড়িগ্রামের উত্তরের সীমানা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র খনন করে নাব্য ফেরানোর জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যদিও প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। আশা করা যায়, যতদ্রুত সম্ভব ড্রেজিং কাজ শুরু হবে।

ব্রহ্মপুত্র নদের যখন এই করুণ অবস্থা, তখন ভারতে প্রবেশমুখে অরুণাচল সীমান্তের কাছে তিব্বতের মেডক কাউন্টিতে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর বাঁধ নির্মাণ করে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে চীন। ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসের কাছে এত বড় আকারে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হলে ভাটিতে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনবে। এরই মধ্যে ভারতও ঘোষণা দিয়েছে, তারা চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মোকাবিলায় অরুণাচলে বাঁধ নির্মাণ করবে। অথচ চীন নিম্ন গতিপথে প্রস্তাবিত বাঁধটি নির্মাণ করলে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হবে এবং তাতে নতুন করে উদ্বেগ-উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তা এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি বিনষ্টের কারণও হতে পারে।

বাস্তবে বাংলাদেশের উজানে চীন ও ভারত অংশে ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ নির্মিত হলে ভাটিতে বাংলাদেশ অংশে ব্রহ্মপুত্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। অন্তত ভাটির দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দুই দেশই এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×