ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

মুখোমুখি অবাধ্য সত্য

সাঁড়াশি অভিযান কোনো সমাধান নয়

সাঁড়াশি অভিযান কোনো সমাধান নয়
×

ড. জিয়া রহমান

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫:৪৯

বাংলাদেশে নিম্নমানের মদপানে মৃত্যুর ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে অতিসম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা বেড়ে গেছে- এমন তথ্য জানাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত দুই সপ্তাহে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর উঠে এসেছে। মৃতদের বেশিরভাগই তরুণ। এ ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বর্তমান সময়ে সমাজের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, বিশেষত যুব সমাজের মধ্যে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, এসব ঘটনা তারই প্রতিচ্ছবি।

সমাজতাত্ত্বিক জায়গা থেকে বিশ্নেষণ করলে এসব ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণগুলো যেমন চিহ্নিত করা যাবে, তেমনি বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বিরাজমান অস্থিরতা প্রশমনে করণীয়গুলোও নির্ধারণ করা যাবে। প্রথমত, বাংলাদেশ সনাতনী সমাজ ব্যবস্থা থেকে আধুনিক সমাজের দিকে উত্তরণ পর্বে অবস্থান করছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে যুগসন্ধিক্ষণ বলা হয়। যেকোনো সমাজ একটি পর্ব থেকে আরেকটি পর্বে উত্তরণকালে তার মধ্যে নানা ধরনের অসঙ্গতি দেখা দেয়। যুব সমাজ যেহেতু সমাজের যেকোনো পরিবর্তনের ধারক ও বাহক, সে কারণে উত্তরণ পর্বের বড় ধাক্কাটি তাদের ওপরই এসে পড়ে। বিগত কয়েক বছরের সামাজিক চালচিত্র বিশ্নেষণে মাদকাশক্তি থেকে শুরু করে গ্যাং কালচার, ভিডিও গেমসকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা, অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি, পর্নোগ্রাফি, একাধিক রোমান্টিক সম্পর্ক এমনকি জঙ্গিবাদের মতো ভয়ংকর কার্যকলাপে যুব সমাজকে নিমজ্জিত হতে দেখি। এটি আসলে বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়। বিশ্বায়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আকাশ সংস্কৃতির বিস্তারে সমাজে বিভিন্ন ধরনের বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যার আঘাত এসে পড়েছে যুব সমাজের ওপর। কাজেই বর্তমান সময়ে অবৈধ ও ভেজাল মদপানে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে আমাদের বড় ফ্রেমের মধ্যেই আলোচনা করতে হবে।

লক্ষণীয় যে, ভেজাল মদপানে মৃত্যুবরণকারী তরুণদের বড় অংশই নিম্নবিত্তের সন্তান। আধুনিকায়ন, নগরায়ণ, বিশ্বায়ন প্রভৃতির ফলে নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যেও এ ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ বিস্তার লাভ করেনি, সেটা বলা যাবে না। বরং নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এই তরুণদের বিত্তবৈভব এবং অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত হওয়ার অবারিত সুযোগ থাকায় তারা অনেকটাই উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে। উদ্বেগজনক অবস্থানে বলছি এ কারণে যে, নগর বিশেষত ঢাকা শহরে তারা ড্রাগ, অবৈধ মেলামেশা, মদপানসহ সব ধরনের আনন্দই অবাধে করতে পারছে। অতিসম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাসহ ঘটে চলা এ ধরনের অসংখ্য দুর্ঘটনা তারই প্রমাণ। ক্ষমতা, অর্থবিত্ত প্রভৃতির কারণে উচ্চবিত্তের সন্তানদের এ ধরনের অপকর্ম চাপা পড়ে যায়। অন্যদিকে, দুর্ভাগ্যক্রমে আইনগতভাবে সিদ্ধ না হলেও উচ্চবিত্তের সন্তানরা তাদের আনন্দ ও অবসাদ উপভোগ করার যে সুযোগ পাচ্ছে, নিম্নবিত্তের তরুণরা সেই অবৈধ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মূলত সমাজ কাঠামোর মধ্যে যে ব্যাপক অসমতা বিদ্যমান, এটা তারই প্রতিচ্ছবি। নিম্নবিত্তের তরুণরা একদিকে যেমন পারিবারিক বন্ধনের সুযোগ থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত, তেমনি সমাজের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। মনে রাখতে হবে, তারাও যুব সমাজের অংশ। উত্তরণ পর্বে তাদেরও আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ থাকা দরকার। সেই সুযোগ না থাকায় তারা নিম্নমানের মদপান কিংবা অন্য কোনো নিম্নমানের আনন্দ উপভোগের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলাফলই এসব অপমৃত্যু।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে একটি দ্বৈতনীতি বিদ্যমান। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মাদকদ্রব্য সেবন ও মদপান বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশনা বা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ কার্যকলাপে নিমজ্জিত হতে দেখি সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির একটি অংশকে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সত্যিই একটি বিচিত্র দেশ, যেখানে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন যেন প্রযোজ্য নয়। মাঝে মাঝে সামাজিক চাপে এ ধরনের বেআইনি ও অনৈতিক কার্যাবলির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হতে দেখা গেলেও তা কিছুদিন পর মিলিয়ে যায়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বক্রাঘাত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে উদারনৈতিক চিন্তা-ভাবনার নেতা হয়েও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মদপান, জুয়া ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিলেন মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বিবেচনায়। অন্যদিকে দেশের ডানপন্থি আদর্শের ধারক-বাহক হয়েও সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে সালে মদ-জুয়ার বৈধতা দান করেন। এটিও একটি বক্রাঘাত। আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের নামে সেনা শাসকরা বিভিন্ন দ্বৈতনীতির মাধ্যমে একদিকে সামাজিক অসমতা, অন্যদিকে সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্যে বিভিন্ন বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। ফলে মদপান, জুয়া প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও সমাজের মধ্যে প্রায়ই এ ধরনের অসঙ্গতি দেখা যায়। আর আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে মাঝে মধ্যে সাধারণ মানুষকে বলি হতে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিষাক্ত মদপানে কয়েকজন তরুণের নিহত হওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার কথা শোনা যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে এটুকু বুঝি যে, মূল জায়গায় আঘাত না করে এ ধরনের সাঁড়াশি অভিযান জনমানসে হয়তো কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি বিধান করতে পারে, তবে এটা কোনো টেকসই সমাধান নয়। অনেকের মনে থাকার কথা, আশির দশকে ভারতীয় শাড়ি আমাদের দেশের ঈদের বাজার ব্যাপকভাবে সয়লাব করে ফেলত। মাঝেমধ্যে ঈদের বাজারে তথাকথিত সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ট্রাকে ট্রাকে আসা ভারতীয় শাড়ি জব্দ করার গল্প শোনা যেত। সীমান্ত ও বিমানবন্দর দিয়ে ভারতীয় শাড়ি অনুপ্রবেশের ব্যবস্থা রেখে মার্কেটে মার্কেটে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা ছিল 'আইওয়াশ' মাত্র। বর্তমান সময়েও সরকারের পক্ষ থেকে 'জিরো টলারেন্স' নীতি আরোপ হলেও মাদকাশক্তি বিশেষ করে ইয়াবায় সমাজ সয়লাব হতে দেখা যায়। সীমান্ত দিয়ে অবাধে ইয়াবা পাচারের ব্যবস্থা রেখে শুধু ইয়াবা বহনকারী ও সেবনকারীদের মধ্যে সাঁড়াশি অভিযান কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। একইভাবে নিষিদ্ধ ও ভেজাল মদের উৎস বন্ধ না করে মাঝে মাঝে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন করা যাবে না। যুব সমাজের মধ্যে এ ধরনের বিচ্যুতিমূলক আচরণ এবং তার ফলে সৃষ্ট এসব দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ দুই জায়গা থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন

×