ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

পাটের কৃত্রিম সংকট

সোনালি আঁশে ধূসর কারসাজি?

সোনালি আঁশে ধূসর কারসাজি?
×

মা-বাবার সঙ্গে জাইন সিদ্দিকী-সংগৃহীত ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫:১৮

দেশের কৃষি ও শিল্পের জন্য যুগপৎ গুরুত্বপূর্ণ পাট খাত নিয়ে যে চিত্র শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। এতে দেখা যাচ্ছে, কাঁচা পাটের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রতিমণ পাঁচ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। কৃষক তার উৎপাদিত পাটের বেশি দাম পাবেন- এই প্রত্যাশা আমরা অনেকবারই সম্পাদকীয় স্তম্ভে ব্যক্ত করেছি। কিন্তু বর্তমান মূল্য আমাদের উদ্বিগ্ন করছে দুই দিক থেকে। প্রথমত, এই মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকের কোনো লাভ হচ্ছে না। এর মধ্য দিয়ে বরং মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার ও মজুদদাররা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি মুনাফা করছে। দ্বিতীয়ত, এত চড়া দামে পাট কিনে পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতাধিক বেসরকারি পাটকল এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং বাকিগুলোও বন্ধের উপক্রম। আমরা মনে করি, এর প্রভাব কেবল সাময়িক হবে না। কাঁচাপাটের দাম ও জোগান সংকটে যদি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কৃষি ও অর্থনীতিতে দেখা দিতে পারে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে যেমন পাটপণ্যের রপ্তানিতে ধস নামবে, তেমনই আন্তর্জাতিক অনেক বাজার হাতছাড়া হয়ে যাবে। আবার পাটকল না থাকলে আগামী মৌসুমগুলোতে কৃষক তার উৎপাদিত কাঁচা পাটের ন্যায্যমূল্যও পাবেন না। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকায় দেখা দেবে এর নেতিবাচক প্রভাব।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত অবিলম্বে সংকট নিরসনে উদ্যোগী হওয়া। অস্বীকার করা যাবে না যে, অতিবৃষ্টি, আম্পান, দফায় দফায় বন্যাসহ প্রাকৃতিক নানা কারণে গত মৌসুমে পাটের উৎপাদন খানিকটা কম ছিল। কিন্তু তাতে করে পাটের বাজারে এমন হাহাকার সৃষ্টি হওয়ার কারণ ছিল না। কারণ গত বছর মার্চে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। পাট উৎপাদন ও কাঁচাপাট রপ্তানির যোগ-বিয়োগ করলেও দেশে এখন মোট ২৩ লাখ বেল কাঁচাপাট থাকার কথা। ওই পাটে চালু থাকা বেসরকারি পাটকলগুলোর চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সোনালি আঁশ নিয়ে মজুদদারদের ধূসর কারসাজিতে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি, কর্তৃপক্ষ তৎপর হলে এই কারসাজির কারবার ভেঙে দেওয়া সম্ভব। পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক যদিও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলেছেন, আমরা বৃক্ষের পরিচয় ফলে দেখতে চাই। এক্ষেত্রে নূ্যনতম ঔদাসীন্য বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই। আমরা জানি, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে দেশের প্রধান অর্থকরী এই ফসলটির উৎপাদন ও বাজার উন্নয়নে কতটা মনোযোগ বেড়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছিলেন কৃষক। বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার খুইয়েছিল বাংলাদেশ। আমাদের মনে আছে, শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়ই তোষা ও দেশি পাটের জীবনসূত্র উন্মোচন হয়েছিল।

এখন যখন দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে পাটের বাজার সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে জরুরি; তখনই পাটশিল্পে এমন পরিস্থিতি কেন? এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা অনেকবারই বলেছি যে, পাটের বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনকে সক্রিয় করা হোক। কেবল কাঁচা পাট ও চট নয়; প্রাকৃতিক তন্তুর সম্ভাবনার এই সময়ে পাটজাত সুতা, বস্ত্র ও ফ্যাশন পণ্যের যে বিপুল চাহিদা বিশ্বজুড়ে রয়েছে, তা উন্মোচন করা হোক। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে বলেছিলাম। কিন্তু পাটকলই যদি বন্ধ হয়ে যায় বা উৎপাদন করতে না পারে; তাহলে তো সকলই গরল ভেল! আমরা মনে করি, বর্তমান সংকটের সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখে অবিলম্বে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সংকট নিরসনে কেউ কেউ কাঁচাপাট আমদানির পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা মনে করি, এ ধরনের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি কুফলও বিবেচনায় রাখতে হবে। পাটের দেশকে পাট আমদানি-নির্ভর করে তোলার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না।

আরও পড়ুন

×