ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীর অবদান

দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীর অবদান
×

ড. মাহবুবা নাসরীন

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২১ | ১৪:৫২

মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশ আজ ধ্বংসের সম্মুখীন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ। ফলে ভৌগোলিকভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা দরিদ্র ও কিছু দ্বীপরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ দরিদ্র বা ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে যেসব দেশ নাজুক, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। বাংলাদেশের নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের কার্বন নির্গমনের হার শূন্য। অথচ আজ তারাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কাছে সবচেয়ে অসহায়। প্রথমত নারী হিসেবে, দ্বিতীয়ত দরিদ্র পরিবারের সদস্য হিসেবে।

দুর্যোগকালে নারী ও শিশুদের অধিকার সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়। যে কোনো দুর্যোগে বাসস্থান, খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যাতায়াত, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় নারীকেই। দুর্যোগের সঙ্গে টিকে থাকার এসব কৌশল অবলম্বনে পরিবারের নারীর ভূমিকা অপরিসীম। কাজের সন্ধানে পুরুষ যখন বাইরে চলে যায় তখন গৃহভিত্তিক কাজ ও সন্তানের দায়িত্ব নারীকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের জন্য গ্রামীণ নারীরা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ফসল উত্তোলন-পরবর্তী বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কার্যক্রম, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শাকসবজি চাষসহ বিভিন্ন আয়মূলক কাজ করে থাকেন। নারীদের নেওয়া এসব অভিযোজন কৌশল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দৃষ্টির আড়ালে থাকে এবং স্বীকৃতি পায় না। নিজেদের পরিবার রক্ষায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর সামান্য নজর দেওয়া হয় বা একেবারেই উপেক্ষা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারী কেবল নাজুকই নয় বরং এর সঙ্গে কৌশল করে টিকে থাকার বিষয়েও সিদ্ধহস্ত এবং নারীরাই সেগুলো অবলম্বন করেন।

প্রতি বছরের মতো এ বছরও বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছর করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আমরা দিবসটি পালন করছি। বরাবরের মতো আমরা করোনার মধ্যেও দেখছি, দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী-পুরুষ কীভাবে একত্রে কাজ করে। নারী, প্রকৃতি, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা এর আগেও দুর্যোগ মোকাবিলায় নারী-পুরুষকে সমভাবে অবদান রাখতে দেখেছি। যে কোনো দুর্যোগেই আমরা ঘুরে দাঁড়াই। যার ধারাবাহিকতায় আমরা কভিড-১৯ মোকাবিলা করছি।

কমনওয়েলথভুক্ত ৫৪টি দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে কভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়া শীর্ষ তিন অনুপ্রেরণীয় নারী নেতার তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগে কমনওয়েলথের এই স্বীকৃতি আমাদের এক অনন্য অর্জন। এ ছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। এর পেছনেও মূল অবদান রেখেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। বাংলাদেশের সব নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফলে এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। কভিড-১৯ দুর্যোগে অনেক দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ প্রভাব খুব বেশি পড়েনি। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি দুর্যোগ-সহনশীল এবং দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলা করেই তারা এ পর্যন্ত এসেছে।

আমাদের সমাজে অনেকেই নারীকে অসহায় ও দুর্বল হিসেবে অবমূল্যায়ন করে থাকেন। আমাদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে নারীদের নাজুক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু দুর্যোগের সময় সেই নারীরাই পরিবারের খাদ্য সংস্থান ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ করে থাকেন; পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা চিহ্নিত করেন; পরিবারের জন্য নিজস্ব সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেন। তারা লোকায়ত জ্ঞান দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করে থাকেন। কভিড-১৯ অতিমারিতেও আমরা নারীদের একই ভূমিকায় দেখছি।

এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষ পালন করছি। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। এসব অর্জন ধরে রাখতে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় কর্মসূচি নারীবান্ধব করেছে সরকার। অনেক এলাকায় সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচি হিসেবে নারীদের বিভিন্ন কাজে সংযুক্ত করা হয়েছে। নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এও স্বীকার করতে হবে, কভিড-১৯ সময়কালে নারীর নিরাপত্তা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। বাল্যবিয়ে বেড়েছে এবং শিশু-কিশোরীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের যে অর্জন তা ধরে রাখতে প্রয়োজনে বড় পরিসরে বিশেষ বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। 

পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×