ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বিশেষ লেখা

সীমানা মানে না ডেঙ্গু, লড়াই হতে হবে সীমানাহীন

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস আজ

সীমানা মানে না ডেঙ্গু, লড়াই হতে হবে সীমানাহীন
×

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১০:৪৩

প্রতিবছর ১৫ জুন বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব’। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়- ডেঙ্গু মোকাবিলায় কোনো দেশ একা নয়, আবার একা সফলও হতে পারে না। এক সময় যে রোগকে নির্দিষ্ট কিছু দেশের মৌসুমি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, আজ তা বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ বর্তমানে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে এবং প্রতিবছর কয়েকশ মিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।

ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক কারণ কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, যা এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের প্রসার ডেঙ্গুকে নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; এটি পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন নীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়া ডেঙ্গু সামিট ২০২৬ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা সেখানে একত্রে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নতুন ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন। বাংলাদেশ থেকে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করছেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত কয়েক বছরে ডেঙ্গু দেশের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালে যে প্রাদুর্ভাবকে অভূতপূর্ব মনে করা হয়েছিল, ২০২৩ সালে তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওই বছর তিন লাখেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ২০২৪ সালেও সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ ছিল। এসব তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে ডেঙ্গু আর মৌসুমি সংকট নয়; এটি এখন একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি।

পরিস্থিতির জন্য শুধু মশাকে দায়ী করলে ভুল হবে। নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ডেঙ্গু বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের স্তূপ এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এডিস মশার জন্য আদর্শ আবাসস্থল তৈরি করছে। অন্যদিকে জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে মশার প্রজননকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সংক্রমণের মৌসুমও বিস্তৃত হচ্ছে।

ডেঙ্গুর প্রভাব স্বাস্থ্য খাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে অর্থনীতি ও সমাজেও পড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবারগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বাড়ায় উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে নয়, একটি জাতীয় উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোগগুলো মৌসুমি এবং প্রতিক্রিয়াভিত্তিক। রোগী বাড়লে কার্যক্রম শুরু হয়, কিন্তু বছরজুড়ে টেকসই নজরদারি ও প্রস্তুতির ঘাটতি থেকে যায়। এ ছাড়া কীটনাশকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা। এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক নজরদারি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব এবং আবহাওয়ার উপাত্ত একত্রে বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভবিষ্যতের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত উৎস ধ্বংস কার্যক্রমকে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করতে পারলেই দীর্ঘ মেয়াদে সাফল্য আসবে।

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত এবং টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ অবশ্যই এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সফল হতে পারবে।

লেখক : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×