ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সাক্ষাৎকার: মতিয়া চৌধুরী

রাজনীতিতে নারীর অবস্থান কারও দয়ার দান নয়

রাজনীতিতে নারীর অবস্থান কারও দয়ার দান নয়
×

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শেখ রোকন

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২১ | ১৪:৫১

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী বর্তমানে শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য। এই আসন থেকে তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০১৯ কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মতিয়া চৌধুরী ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে ডাকসু সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে কারাবন্দি অবস্থায় তাকে ন্যাপের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। স্বাধীনতার পর তিনি বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কারাজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তার 'দেয়াল দিয়ে ঘেরা' ১৯৭০ সালে প্রথম প্রকাশ হয়। মতিয়া চৌধুরীর জন্ম ১৯৪২ সালে মাদারীপুরে।


সমকাল: আপনার ব্যক্তিগত সহকারী যদিও আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আপনি নিজেকে নারী রাজনীতিক হিসেবে আলাদাভাবে দেখতে চান না, আজকে এ বিষয়েই কথা বলতে চাইছি।

মতিয়া চৌধুরী: উনি ঠিকই বলেছেন। রাজনীতি সাধারণ মানুষের বিষয়, জনগণের বিষয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। সেখানে নারীদের আলাদা করে দেখবেন কেন?

সমকাল: এটা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, ষাটের দশকে আপনার রাজনীতিতে আসার সময় নারীর অংশগ্রহণ এখনকার মতো ছিল না।

মতিয়া চৌধুরী: হ্যাঁ, তখন সীমিত ছিল। ইডেন কলেজের মতো দু-একটি মহিলা কলেজে মেয়েরা ক্লাস ক্যাপ্টেন এবং কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি-জিএস হতো। তাদের কর্মকাণ্ড কলেজ ক্যাম্পাসেই সীমিত থাকত। কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের নারীরা রাজনীতি সচেতন আরও আগে থেকে। ব্রিটিশবিরোধী অগ্নিযুগের আন্দোলনের সময় নারী বিপ্লবীরা ছিল না? প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নাম তো সবাই জানে।

সমকাল: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনেও তো নারীর অংশগ্রহণ ছিল?

মতিয়া চৌধুরী: অবশ্যই ছিল। এখানকার মানুষ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, নারীরাও তাতে যোগ দিয়েছে। ভাষা আন্দোলনে নাদিরা চৌধুরী, আনোয়ারা বেগম, সাফিয়া খানমরা অংশ নিয়েছিলেন। তখন আমার বয়স ছিল দশ, তেমন কিছু বুঝতাম না। তারপরও ভাষার জন্য ছাত্রদের হত্যার কথা যখন শুনেছি, আমরা স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছি।

সমকাল: সক্রিয় রাজনীতিতে কীভাবে এলেন?

মতিয়া চৌধুরী: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পরে আটান্নর সামরিক শাসন, তারপর একটা রাজনৈতিক শূন্যতা ছিল। ১৯৬২ সালে এসে প্রথম ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। সক্রিয় রাজনীতিতে আমার শুরুটা তখনই। ইডেন কলেজে পড়ার সময় শুনতাম পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল-মিটিং হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ, তখন সেটা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। আমরা ইডেনে থেকে দেয়ালের ওপাশ থেকে ছাত্রদের স্লোগানের শব্দ শুনতাম। সেসব মিছিল-মিটিংয়ে ছাত্রীরা না গেলেই কলেজ কর্তৃপক্ষ খুশি হতো। তারপরও আমরা যেতাম, কখনও কখনও দেয়াল টপকিয়ে।

সমকাল: আপনি ডাকসু জিএস হওয়ার পরের মেয়াদে ডাকসু ভিপি হয়েছিলেন মাহফুজা খানম। তিনিও ইডেন থেকে এই দেয়াল টপকানোর কথা আমাদের বলেছিলেন।

মতিয়া চৌধুরী: মাহফুজা খানম যখন সংগঠনের সম্মুখসারির নেতা হন, ততদিনে আমি জেলে বন্দি হয়েছি। তিনি যখন কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে আসেন, তখন আমরা একসঙ্গে মিছিল-মিটিংয়ে গিয়েছি। ওই সময়টাই ছিল, জনে জনে জনতা হওয়ার অবস্থা।

সমকাল: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তো ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে।

মতিয়া চৌধুরী: আমি তখনও জেলে। ১৯৬৪ সালের ১৮ জুন আমার বিয়ে হলো, ১৭ জুলাই প্রথম গ্রেপ্তার হই। এর পর সাত মাস বাইরে ছিলাম। পরে আবার জেলে। একটানা জেলে। আমাকে ঢাকায়ও রাখা হয়নি, ময়মনসিংহে পাঠানো হয়েছিল।

সমকাল: জেল জীবনের অভিজ্ঞতা কিছু বলবেন?

মতিয়া চৌধুরী: আপনি আমার বইটি পড়েছেন?

সমকাল: হ্যাঁ পড়েছি। আপনি জানেন কিনা জানি না, আপনার 'দেয়াল দিয়ে ঘেরা' এখনও বেশ জনপ্রিয় বই। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ, ওই বইয়ে আপনি নিজের কথার চেয়ে জেলে অন্যান্য নারী বন্দিদের কথা বেশি বলেছেন।

মতিয়া চৌধুরী: অন্যদের কথার মধ্যেই মিশে রয়েছে আমার কথা। রাজনীতি তো আসলে নিজের জন্য নয়। সমাজের অন্যদের দুঃখ-দুর্দশা অনুধাবন করা এবং সে জন্য কাজ করে যাওয়া।

সমকাল:  যে সমাজের মুক্তির জন্য রাজনীতি করেছেন, জেলে গেছেন, নারী রাজনীতিক হিসেবে তাদের সমর্থন কতটা পেয়েছেন?

মতিয়া চৌধুরী: ওই সময় সাধারণ মানুষ বেশ উদার মনের ছিল। ছাত্র-ছাত্রী বা রাজনীতিকদের প্রতি সমীহ পোষণ করত। তখনকার ঢাকা হোটেলের কাছে তিন নম্বর কাজী আব্দুল হামিদ লেনে আমাদের বাড়ি ছিল। লোকে এটাকে চিনত 'বান্দরের গলি' নামে। কারণ তখন পুরান ঢাকায় বাঁদরের উৎপাত ছিল। মিছিল-মিটিং শেষে আমি কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার পরে বা রাতে বাসায় ফিরতাম। কিন্তু কোনোদিন কারও মুখ থেকে কোনো শ্নেষাত্মক বা বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য শুনিনি। পুরান ঢাকার নিজস্ব ঐতিহ্য থাকলেও আমি কখনও সামাজিক রক্ষণশীলতার বাধার সম্মুখীন হইনি।

সমকাল: নবাব পরিবার তো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল।

মতিয়া চৌধুরী: নবাব পরিবার বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষ আমাদের পক্ষে ছিল। আমি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আমার কোনো লেটার অব ইনট্রোডাকশন নেই। আমরা যখন রাজনীতি করেছি, তখন নিজস্ব গাড়ির কথা চিন্তা করা যেত না। রিকশায় আসা-যাওয়া করতাম। ঢাকা হোটেলের সামনে নামতাম। বাকিটা পথ হেঁটে হেঁটে বাসায়। আমাদের সময় রাজনীতির জন্য শ্রম দিতে হতো।

সমকাল: রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবার থেকে উৎসাহ পেয়েছেন?

মতিয়া চৌধুরী: পরিবার বিশেষ করে আমার বাবা আমাকে খুব উৎসাহিত করেছেন। তিনি বরিশাল বিএম কলেজে পড়ার সময় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বন্ধু ও রুমমেট ছিলেন। বাবা স্বল্পবাক কিন্তু স্বাধীনচেতা ছিলেন। একরোখা ভাবটা মনে হয় পৈতৃক সূত্রেই পেয়েছি।

সমকাল: কখন ঠিক করলেন যে, পূর্ণকালীন রাজনীতি করবেন?

মতিয়া চৌধুরী: খুব চিন্তা-ভাবনা করে রাজনীতিতে এসেছি, তা কিন্তু নয়। যেমন ইডেনের হোস্টেলে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, ওই সময় সবাই নির্বাচনের বিষয়ে আলাপ করতে করতেই আমাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বলে। তারপর ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হয়ে গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্রী ছিলাম, সেখানে ভোটার সংখ্যা কম। আমি হলেও থাকতাম না। তারপরও ডাকসু জিএস হয়েছিলাম।

সমকাল: আজকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে নারী নেতৃত্ব, তাদের একটি বড় অংশ বোধ হয় ষাটের দশকের সোনালি সময়ের ফসল।

মতিয়া চৌধুরী: ১৯৬২ ও ১৯৬৪ সালের তুলনায় ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি ছিল। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে নারী নেত্রীদের অনুৎসাহিত করা হতো। এমনকি ইডেনে যখন ছিলাম, তখনও আমার অনেক সহপাঠী এড়িয়ে চলত। অনেকেই বলত, মতিয়ার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু ষাটের দশকের শেষের দিকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধেও তো আমাদের নারীরা ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছেন।

মতিয়া চৌধুরী: উনসত্তর থেকেই নারীরা আগের তুলনায় বেশি এগিয়ে আসতে থাকে। আপনি বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের ভিডিও দেখবেন, জনসভায় কত নারী অংশ নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নারীরা রাইফেল হাতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, সেই ছবিও পাবেন।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধে আপনি যোগ দিলেন কীভাবে?

মতিয়া চৌধুরী: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকা থেকে অনেক ঘুরে সীমান্ত এলাকায় গেছি। কারণ রাজাকার বা পাকিস্তানি আর্মি আমাকে চেহারায় চিনত। ২৫ মার্চ রাতে আমি খিলগাঁওয়ে আত্মগোপনে ছিলাম। সেখান থেকে বেরাইদ, পলাশ, ঘোড়াশাল হয়ে বের হয়ে যাই। কখনও বোরকা পরে, ঘোমটা দিয়ে চলেছি।

সমকাল: তার মানে শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র নদীপথে?

মতিয়া চৌধুরী: তখন তো হাঁটা আর নদীপথে নৌকা ছাড়া কোনো পথ ছিল না। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের নানাবাড়ি ছিল গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। আমরা সেখানে কয়েকদিন ছিলাম। সেখান থেকে সরারচর হয়ে সুনামগঞ্জ হয়ে বালাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে প্রবেশ করি। সেখান থেকে আগরতলায়।

সমকাল: ওই যাত্রার কথা মতিউর রহমানও বিভিন্ন সময় লিখেছেন।

মতিয়া চৌধুরী:  সেই সময়টা আসলে যৌথতার ছিল। আমরা সবাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছি এবং স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারী বা পুরুষ ভেদ ছিল না।

সমকাল: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার আগে ও পরে গুণগত কোনো পার্থক্য রয়েছে?

মতিয়া চৌধুরী: আমি বলব, না নেই। কারণ স্বাধীনতার পরও নারীরা রাজনীতিতে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। মিছিলে, মিটিংয়ে, আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে।

সমকাল: বর্তমান রাজনীতিতে নারীর গুণগত অংশগ্রহণ নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

মতিয়া চৌধুরী: আমি মনে করি এটাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা দরকার। কারণ আমরাও যখন রাজনীতিতে এসেছি তখনও যে সবাই আমাদের প্রশংসা করেছে বা উৎসাহ দিয়েছে তা কিন্তু নয়। অনেক শিক্ষক আমাকে নিয়ে হা-হুতাশ করেছেন। এদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ হঠাৎ বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনীতিতে নারীর অবস্থান কারও দয়ার দান নয়। এটা একটি ধারাবাহিকতার ফসল। মনে রাখা উচিত, ১৯৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহ সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হয়েছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনি বেশি ভোট পেয়েছিলেন।

সমকাল: টানা তিন দশক আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার আসনে রয়েছেন নারী। রাজনীতিতে এর ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটছে?

মতিয়া চৌধুরী: মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনা একজন নারী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা হননি বা প্রধানমন্ত্রী হননি। পঁচাত্তরের পর তিনি দেশে আসার আগেও আমরা অনেকদিন সময় পেয়েছি। তখন দল গোছাতে পারিনি। ১৯৮১ সালে তিনি আসলেন আর ১৯৮৩ সালে দল ভাঙা হলো। আবার ১৯৯১ সালে আমরা নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারলাম না। তখন দলে আরেক দফা ভাঙন দেখা দিল। একদিকে কণ্টকাকীর্ণ পথে শেখ হাসিনার পা রক্তাক্ত হয়েছে, অন্যদিকে বড় বড় ঝাপটায় নৌকার হালের দড়ি ছেঁড়ার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু তিনি অনড়-অচঞ্চলভাবে পথ পাড়ি দিয়েছেন। তার আগে ড. কামাল হোসেন বা জেনারেল ওসমানী আওয়ামী লীগ থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছেন। তারা তো দলকে ক্ষমতায় নিতে পারেননি। রাজনীতিটা নারী-পুরুষের প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা হলো রাজনৈতিক আদর্শ উপলব্ধি ও চর্চা করতে পারা। মানুষের অধিকারের জন্য মূল্য দিতে পারার প্রশ্ন। ভেতর থেকে কষ্ট, বেদনা ও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠার বিষয়। জ্বলে ওঠা মানে সবকিছু জ্বালিয়ে দেওয়া নয়, বরং আলো দিয়ে আলো জ্বালানো। শেখ হাসিনা সেটাই করেছেন। আলো দিয়ে আলো জ্বালিয়েছেন।

সমকাল: বিএনপির ক্ষেত্রেও কি একই কথা বলবেন?

মতিয়া চৌধুরী: স্বীকার করতে হবে, খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার মতো ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসেননি। কিন্তু বিএনপি তার প্রয়োজনে বেগম খালেদা জিয়াকে নেতার আসনে বসিয়েছে। তিনি বিএনপির নেতা হওয়ার আগে দলটির পুরুষ নেতারা সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেননি।

সমকাল: অভিযোগ আছে, নারী রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ মূলত পুরুষ নেতাদের আত্মীয়-স্বজন।

মতিয়া চৌধুরী: ডোন্ট বি আনকাইন্ড টু দেম। বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা সন্তান যখন রাজনীতির জন্য জেলে যায়, তখন ওই পরিবারের নারীদেরই ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় হয়তো বাজার করার টাকা থাকে না। সম্প্রতি ফরিদপুরের রুশেমা ইমাম মারা গেলেন, ইমাম উদ্দিন আহমাদ ভাইয়ের স্ত্রী। বিরোধী দলে থাকতে আমি ফরিদপুরে গিয়ে দেখেছি, তিনি একদিকে স্কুলে চাকরি করছেন, অন্যদিকে বাসার কাজও সামলাচ্ছেন। তখন আমরা ডাকবাংলো পেতাম না, হোটেলেও মেয়েরা উঠতে পারত না। ওই বাড়িতে উঠতে হতো। তখন তাদের বাসায় গেস্টরুম ছিল না। দেখা গেল ইমাম ভাই বাইরে, আমি আর ভাবি একরুমে থাকতাম। এসব না জেনে প্রশ্ন তুললে হবে না।

সমকাল: প্রশ্নগুলো সমাজে আছে, তাদের পক্ষ থেকে জানতে চাইছি।

মতিয়া চৌধুরী: প্রশ্নগুলো সমাজে অবশ্যই আছে। কিন্তু সবাই শুধু সুখের দিনগুলো দেখে, দুখের দিনগুলো দেখে না। ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে আর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে সেগুনবাগিচার ভাড়া বাসা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন জেল থেকে ফিরে আসলেন তখন ধানমন্ডির প্লটে কোনোরকমে দুই রুমের একটি বাড়ি করলেন। লেবার খরচ কমাতে বেগম মুজিব কখনও কখনও নিজেই ইট ধুয়ে দিতেন। এগুলো দেখতে হবে।

সমকাল: রাজনীতিতে নারীর এই অবদানের স্বীকৃতি কীভাবে আসবে?

মতিয়া চৌধুরী: প্রথমেই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আমি তৃণমূলেও দেখেছি, যখন নারী রাজনীতিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারে না, তখন পুরুষ নেতাকর্মীরা তাকে নারী হিসেবে অবমূল্যায়ন করতে চায়।

সমকাল: গত অর্ধশতকে স্বাধীন বাংলাদেশে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে। সেই অনুপাতে রাজনীতিতে কি এগোতে পেরেছে?

মতিয়া চৌধুরী: দেখুন, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে কাজ, সেগুলো শেখ হাসিনার অবদান। শেখ হাসিনা মনে করেন না যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বলেই নারীর অধিকার নিশ্চিত হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা বরং মনে করেন, নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত। নারীকে স্বাবলম্বী করে তুলতে তাই তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। নারীর অধিকার, মর্যাদার প্রশ্নে তিনি কোনো ছাড় দেন না। একানব্বই সালে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল যে, ভোটার তালিকায় বাবার সঙ্গে মায়ের নামও থাকতে হবে। পরে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন।

সমকাল: দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীকে পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলো পূরণ করতে পারল না কেন?

মতিয়া চৌধুরী: এটা পূরণ করতে তো বাধা নেই। কিন্তু সমাজের বাস্তবতাও বুঝতে হবে। যারা একসময় অন্তঃপুরবাসিনী ছিল, তারা আজ রাষ্ট্র ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত, নেতৃত্ব দিচ্ছে। কাজের ভেতর দিয়েই তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং এগিয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তা সম্ভব হবে বলে আমি আশাবাদী। রাজনীতিতে নারীর যোগদান ও নেতৃত্ব গ্রহণে কোথাও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

সমকাল: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মতিয়া চৌধুরী: সমকালের জন্য শুভ কামনা।

আরও পড়ুন

×