সমকালীন প্রসঙ্গ
জন কেরির সফর ও জলবায়ু কূটনীতি
ড. মাহবুবা নাসরীন
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২১ | ১৪:২৭
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'লিডার্স সামিট'-এ আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাতে কয়েক দিন আগে ঢাকা সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি। ওবামা প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও ২০১৬ সালে ঢাকা সফর করেছিলেন তিনি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করলে এবারের সফর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।
আগামী ২২-২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য 'ভার্চুয়াল লিডার্স সামিট' আসলে একটি বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই সম্মেলন আহ্বান করেছেন এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৪০ জন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের অন্তর্ভুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বই নির্দেশ করে। কেবল বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের দিক থেকেও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের প্রদত্ত বিবৃতি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জো বাইডেন সরকার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। কিছুদিন আগেও ট্রাম্প প্রশাসনে যার উল্টোটাই লক্ষ্য করা গেছে। আমরা দেখেছি চল্লিশের দশকে উদ্ভাবিত ডুমস দিবসের ঘড়ি (ডুমসক্লক) ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করায় মধ্যরাতের কাছাকাছি এগিয়ে গিয়েছিল। যার অর্থ- পৃথিবী ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে জো বাইডেনের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে ডুমসক্লক প্যানেল স্বাগত জানিয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাইডেন সরকারের বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ের কেন্দ্রে জলবায়ু পরিবর্তনকে স্থাপন করার প্রয়াসে। ৪০ বিশ্বনেতার অংশগ্রহণে এপ্রিলের এই ভার্চুয়াল সম্মেলন তাই অনেক অর্থবহ। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবেন, যা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে।
বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী আলোচিত। কারণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস, সহনশীলতা ও অভিযোজন কৌশল ও সরকারি ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ' পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে তার সরকারের গৃহীত নীতিমালা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন ও টেকসই অর্থনৈতিক জলবায়ু গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্বব্যাপী অনুকরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সূত্রমতে, বিশ্ব নেতাদের এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্বে সফলতার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মার্শা বার্নিকাটের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কিছু শেখার আছে। তাই এ দেশটি জলবায়ু সংকট নিরসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
'ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম' তথা সিভিএফ এবং 'ভালনারেবল টোয়েন্টি গ্রুপস অব ফিন্যান্স মিনিস্টারস' তথা ভি-টোয়েন্টি প্রধান হিসেবে ২৬তম জলবায়ু সম্মেলনও সফল করার অন্যতম অনুষঙ্গ হবে বাংলাদেশ। যে দেশটিতে কার্বন-নির্গমনের হার সবচেয়ে বেশি সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার এই বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে গৌরবের ও আশাব্যঞ্জক।
বিগত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৫) প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছিলেন, প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। জো বাইডেন সরকারের লক্ষ্য প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। অতীতে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, টেকসই উন্নয়নের ধারণা নিয়ে প্রথম বৈশ্বিক কমিশন ছিল ব্রান্ডটল্যান্ড কমিশন, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দূষণমুক্ত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ পরিবেশ রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার। নব্বইয়ের শেষ দিকে সেই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলে আজকের পৃথিবীকে পরিবেশ বিপর্যয় বা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এত বেশি মূল্য দিতে হতো না।
সে যা হোক, দেরিতে হলেও ২০১৬ সাল থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এগুলোর কেন্দ্রে বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ ও জলবায়ু নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়ক। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দরিদ্র, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল দেশ বা ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো দায়ী নয়, তথাপি শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এসব দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের জনগণ এর মূল্য দিচ্ছে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিল্পোন্নত দেশের সহায়তা পাবে। এটাই প্রত্যাশা করা যায়। বাংলাদেশের অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা, ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা, সহনশীলতা ও অভিযোজন কৌশলের সঙ্গে বৈশ্বিক অতিমারি কভিড-১৯ সম্পৃক্ত। ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলা কভিড-১৯ জনিত সংকটকে পরিকল্পনার মধ্যে এনে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ধরে রাখার প্রয়াস নেওয়ার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
বিশ্ব নেতৃত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সকল ঝুঁকি বা দুর্যোগ বা আপদ যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কর্মসূচি, খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টি অব্যাহত রাখতে হবে। প্যারিস চুক্তির অঙ্গীকারের আলোকে জন কেরি ভারত ও বাংলাদেশ সফরকালে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ কারণে তিনি নারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও আমন্ত্রণ তাই একজন ব্যক্তির বাংলাদেশ সফর নয় বরং এর সঙ্গে অনেক ইতিবাচক সুদূরপ্রসারী বার্তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অবগত যে, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, বন, পানি, পশুসম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলো অনুকরণযোগ্য। সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো ও স্বীকৃতি দেওয়া জলবায়ু কূটনীতির একটি সফল মাইলফলক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার লড়াইয়ে একটি 'গ্লোবাল মোমেন্টাম' সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্লিপ্ততা বাংলাদেশসহ বাকি বিশ্বের জন্যই ছিল হতাশাজনক। এখন যে ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার সুফল ঘরে তুলতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে বাংলাদেশকে। 'ভার্চুয়াল লিডার্স সামিট'-এ আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমার প্রত্যাশা।
পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- ড. মাহবুবা নাসরীন
