ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জলবায়ু-রাজনীতি এবং বাইডেনের 'লিডার্স সামিট'

জলবায়ু-রাজনীতি এবং বাইডেনের 'লিডার্স সামিট'
×

সোমবার হুইলচেয়ারে করে নির্বাচনী প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়- সংগৃহীত

কাজী মারুফুল ইসলাম, হাসান মেহেদী ও শেখ রোকন

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে যাবে। প্রতিশ্রুতি অনুসারে তিনি ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনই প্যারিস চুক্তিতে অংশ নেওয়ার নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর পরপরই তিনি এপ্রিলের ধরিত্রী দিবসে বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেন। লোকমুখে সম্মেলনটি 'বাইডেন জলবায়ু সম্মেলন' নামে পরিচিত হলেও খাতা-কলমে এর নাম 'লিডার্স সামিট অন ক্লাইমেট'। আগামী ২২ ও ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য এ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪০ জন রাষ্ট্রনেতা যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ক্ষমতায় এসেই ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ জলবায়ু সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই সনদ অনুসারে 'ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও তুলনামূলক সক্ষমতা' বিবেচনায় জলবায়ু-দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রত্যেক দেশের দায়দায়িত্ব নির্ধারিত হয়। কিন্তু সেই দায়দায়িত্ব কতটুকু পালন করা হয়েছে, সেটা একটু দেখা যাক। জলবায়ুবিষয়ক সব চুক্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকলে সই করে। আবার যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা সই করেও প্রটোকলটি অনুমোদন করেনি। একইভাবে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুমোদন করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান। ফলে জলবায়ু-দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটিকে কখনোই আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা যায়নি।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র একাই সারা দুনিয়ার ১৫ শতাংশ কার্বন নির্গমন করে। মাথাপিছু নির্গমনের দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উন্নত দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ এবং মোট জাতীয় নির্গমনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। কার্বনব্রিফের গবেষণা অনুসারে, ১৮ শতকের শিল্পবিপ্লব থেকে হিসাব করলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সর্বোচ্চ কার্বন নির্গমনকারী দেশই নয়, বরং সবচেয়ে খারাপ নির্গমনকারীও বটে। পৃথিবীজুড়ে মার্কিন বাণিজ্যের ফলে যে কার্বন নির্গমন হয়, তা এ হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানি এবং তাদের অংশীদাররা যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করেন, তার পরিমাণ আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে।

শুধু বাংলাদেশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো ৪৮টি জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ হাজার ৭১০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৫ হাজার ৪২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু আছে, ৫ হাজার ২৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন, ৭০০ মেগাওয়াটের কোহেলিয়া কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং ৬ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তাবিত রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিকেরই ১৫০০ গ্যাস ইঞ্জিন বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়া মহেশখালীর দুটো এলএনজি টার্মিনালই মার্কিন কোম্পানির নির্মিত।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে অবশ্যই নতুন করে আশার বাণী শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন নিতান্ত বাগাড়ম্বরে পরিণত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এ কারণেই সারা দুনিয়ার পরিবেশকর্মীরা কয়েকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা দেখতে চায়।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নির্গমন কমানের জাতীয়ভাবে স্ব-নির্ধারিত অঙ্গীকার (এনডিসি) ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নির্গমন কমালেই চলবে না; বিশ্বব্যাপী মার্কিন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের নির্গমন কমানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এনডিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরাসরি সহায়তা দিতে হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু-ঝুঁকি নিরসনে ২০২০ সাল নাগাদ সবুজ জলবায়ু তহবিলে (জিসিএফ) প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি উন্নত দেশগুলো কখনোই পূরণ করেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে ১ বিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র তার দায়দায়িত্ব ভুলে গেছে। সবুজ জলবায়ু তহবিলে অর্থ সরবরাহ করার পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

পৃথিবীতে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারী সবচেয়ে বড় ১০টি ব্যাংকের চারটিই মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। জীবাশ্ম জ্বালানিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাঁচটি বিনিয়োগকারী কোম্পানির চারটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সবচেয়ে বড় দুটি কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন। এসব প্রতিষ্ঠান একত্রে পৃথিবীর জ্বালানি খাতের ১৮-২৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ না করে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা খুব সামান্যই অর্জিত হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন পৃথিবীর পুঁজিবাজারের কেন্দ্র, তেমনি প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও অন্যতম অগ্রসর দেশ। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মালিকানা মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে রয়েছে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি-উদ্ভাবক কোম্পানিগুলোর যৌথ সহায়তায় বাংলাদেশে ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করা সম্ভব। সমাজভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি একদিকে যেমন বাংলাদেশের গ্রামীণ কর্মসংস্থান, সবুজায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে তা বিশ্বব্যাপী 'সবুজ পুনরুদ্ধারে' মার্কিন নেতৃত্বের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক দেরি হয়ে গেছে; তাই উদ্যোগ নিতে হবে এখনই! দ্বিমুখী নীতি ছেড়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক দেনাবিষয়ক কর্মজোটের সদস্য

আরও পড়ুন

×