ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যে কারণে অনন্য উচ্চতায়

যে কারণে অনন্য উচ্চতায়
×

ড. মাহবুবা নাসরীন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২১ | ১২:০০

পৃথিবীতে একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের জন্মের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। যে যুবক বিশ্বমানচিত্রে এঁকে দিয়েছেন এক নতুন দেশের নাম, তার পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি। এই বিশ্ববিদ্যালয় আর সেই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষের শতবর্ষে পদার্পণ পরপর দু'বছরে। আর দেশটির বয়স হলো অর্ধশত বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ইতিহাসের অনন্য স্থানে উচ্চাসনে কেন রাখতে হবে তা ভাবার জন্য খুব বেশি গভীরে যেতে হয় না। কারণ, পৃথিবীতে এটিই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি ক্যান্টিন পরিচালকও আত্মাহুতি দিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ে। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে তাই সব অর্জন ছাপিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আত্মত্যাগী মহান মুক্তিযোদ্ধা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ শহীদ ও অন্যান্য মহতী মানুষের বীরত্বগাথা দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন দেশের জন্মের উন্মেষ যেমন ঘটেছে, তেমনি নতুন জ্ঞানের উন্মেষ ও অন্বেষণের সূতিকাগার হওয়ার গৌরবও রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই। সাহিত্য আর কলার মতো বিষয়বস্তু নিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯২১ সালে, শতবর্ষে এসে সে বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়ায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বে নতুন জ্ঞানের প্রবক্তা হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই সাহিত্য, শিল্পকলা ও বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিতসহ অন্যান্য জ্ঞানকাণ্ডে প্রবেশ করেছেন। পরবর্তীকালে বিশ্বের নতুন নতুন শাখায় তার বিচরণ ঘটেছে। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের সময় এই বাংলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, আবাসন, বৃত্তি, বিদেশি ডিগ্রি, চাকরি সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হতে হতো। আমার বাবা চল্লিশের দশকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠন-পাঠনের সুযোগ পেতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন জেনেছি। অবিভক্ত ভারতে এই বাংলায় বসবাস করে তিনি মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেতে তাকে পশ্চিমবাংলায় গিয়ে কঠোর পরিশ্রমে অর্জন করতে হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক ফল। বাঙালি শিক্ষার্থীদের তখন অনেকটাই বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি আবাসিক হলে অবাঙালি শিক্ষার্থীদের বসবাসের অধিক সুযোগ ছিল- মাত্র পাঁচজন বাঙালি ছাত্রের মধ্যে একটি আবাসিক হলে মেধাবী ছাত্র হিসেবে আমার বাবার থাকার সুযোগ হয়েছিল- এই ইতিহাস তার কাছ থেকে শুনেছি।
বাঙালি শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন মর্যাদা দেওয়া হয়নি, আর সেই বেদনার তীব্রতাও তাদের ভাষা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছে। যে বঞ্চনা, অবহেলার শিকার হয়েছে পুরো বাঙালি জাতি, তা থেকে মুক্তি পেতেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই বপন করেছিল স্বাধীনতার বীজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্যতা এখানেও সবকিছু ছাপিয়ে যায়। আজ শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবগাথার কথা বলতে গিয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে স্মৃতিচারণাই সামনে আসে। কারণ, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পাঠের সুযোগ হয়েছিল আমার বাবার। একে একে অগ্রজ ভাইবোন, পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজন। সাহিত্য, সামাজিকবিজ্ঞান, বিজ্ঞানে তারা পেয়েছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিতদের সাহচর্য। স্বাধীন দেশের স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ে পণ্ডিতরা নিজ নিজ আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। নতুন জ্ঞানের সন্ধানে সারা পৃথিবীকে পেছনে ফেলেছেন অনেকেই। বাংলাদেশ থেকে যখন উচ্চশিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা যোগ দিয়েছেন, তাদের জ্ঞানের বিস্তারে বিদেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের 'স্বনামধন্য' বলে পরিচিতি রয়েছে, তারা প্রশংসা করেছেন। নানা বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা তাদের স্বকীয়তা তুলে ধরেছেন; যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
ব্যক্তিগত অনেক কথাই আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে বলতে হচ্ছে। মেধা তালিকায় মানবিকে চতুর্থ স্থান অধিকার করে অগ্রজের মতো ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার আগ্রহ দেখিয়ে ছিলাম। কিন্তু প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আমার অভিভাবকরা যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন তারা বললেন, 'সমাজবিজ্ঞান পড়। এখানে ভবিষ্যতে অবদান রাখার অনেক সুযোগ রয়েছে।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলেই তাদের এই দূরদৃষ্টি ছিল তা বিশ্বাস করি।
তুলনা করতে পারি নিজেকে অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যারা আমার মতোই বিভিন্ন দেশে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে কমনওয়েলথ বৃত্তিসহ একটি উন্নত দেশে আমার সহপাঠী ছিলেন। তারা পরিবেশ, দুর্যোগ, পরিসংখ্যান, সমাজ গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর শরণাপন্ন হন, সেই ত্রিশ বছর আগের নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমুখী পাঠদানকে স্মরণ করি। মূল বিষয়ের বাইরেও অন্য বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের তৈরি করেছিল স্বাধীনতার পর থেকে। সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে, বিতর্ক চর্চাসহ অন্যান্য বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে। কমনওয়েলথ বা অন্যান্য বৃত্তি নিয়ে আমার সতীর্থ যারা বিভিন্ন দেশ থেকে আমার সহপাঠী ছিলেন, তাদের সিংহভাগই প্রবাসী হওয়ার আবেদন করেছেন। ব্যতিক্রম আমরা- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর দেশ আমাদের ফিরে এসে আহরিত নতুন জ্ঞান সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আজ তাই বলতে পারি, বাংলাদেশের পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক বা শিক্ষার্থী হয়েছিলাম বলেই কিছুটা জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি। স্বীকৃতি বা পুরস্কার এগুলোর জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কাজ করেন না বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকে যুগোপযোগী জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিতি ঘটাতে সহায়তা করেন। যার জন্য বিশ্বের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় 'মানসম্মত' বলে বিবেচিত হয়, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রেখে আমাদের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় আগ্রহী হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক গবেষণায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্ব দেয়। পরিবেশ, দুর্যোগ এসব বিষয় পৃথিবীর অন্যান্য দেশের 'স্বনামধন্য' বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন স্বতন্ত্র হিসেবে স্থান পেয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটির উন্মেষ ঘটেছে একই সময়ে বা তার আগে। অনেক ক্ষেত্রে 'পরিবেশ' শব্দটা বিষয়ের সঙ্গে না থাকলেও সেটি যুক্ত করা হয়েছে ইনস্টিটিউট, বিভাগের সঙ্গে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশ বিভাগের অব্যবহিত পর থেকেই পরিবেশবিষয়ক পঠন-পাঠন হতো, যা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে স্বাধীনতার পরপরই। সবুজঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরাজি; পাখির কলকাকলিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকাল হতো। পরিবেশ বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ অবতারণার কারণ এই বিষয়গুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশ ও বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করেছে। পরিবেশবিষয়ক পঠন-পাঠন শুরুতে শুধু বিজ্ঞানের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃতি লাভ করে সামাজিক বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে 'পরিবেশ'সংক্রান্ত পাঠ বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের অংশ। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয় পর্যায়ে পরিবেশ ও দুর্যোগ বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়েছে, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
শিল্প সমাজে পরিবেশদূষণ বিষয়টি বরাবরই গুরুত্বের বাইরে ছিল। কারণ, তাদের লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি। তারা কিন্তু নিজ দেশের দূষণ রোধে প্রযুক্তি আবিস্কার করলেও সারা পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ তথা মানুষ ও অন্য প্রজাতিকে যে বিলুপ্ত করছে, সেই আলোচনায় সোচ্চার হয়নি। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পরিবেশ তারা দূষণ করছে- এ দেশের কৃষি, বনজ, জলধারা, মৎস্যসম্পদ, বন্যপ্রাণী, শক্তি তথা সমগ্র জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, জীববৈচিত্র্যকে ভয়ানকভাবে হ্রাস করছে- এই বিষয়গুলো পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে তুলে ধরেছি কীভাবে 'প্রতিবেশগত বিপর্যয় মানবসমাজের জন্য ক্ষতিকর'। বিজ্ঞানের দিকটিও প্রমাণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশের সরকারি, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, গণমাধ্যমও সোচ্চার হয়েছে পরিবেশ রক্ষার সংকল্পে ক্রমান্বয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা সম্মিলিতভাবে পরিবেশ রক্ষায় অতীব জোরালো ভূমিকা রাখা শুরু করেন আশির দশক থেকে। কারণ ওই সময়ে পরিবেশ বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছিল। ১৯৯৮ সালে সমাজবিজ্ঞান সমিতি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রধান বিষয়বস্তু করেছিল 'সমাজবিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, নারী ও পরিবেশ'। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশের পঠন-পাঠন স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের আওতায়। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশে পরবর্তীকালে সরকারি পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অসামান্য অবদান। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকিতে বাংলাদেশকে অন্যতম হিসেবে ধরা হয়। প্রধান কারণ, এর ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই ব-দ্বীপটি নিম্ন অববাহিকায় নাজুক অবস্থানে রয়েছে। দেশের তিনটি বড় নদীর উৎস প্রতিবেশী দেশে। যাদের মিলন ঘটেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে চিহ্নিত করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা এগুলোকে 'প্রাকৃতিক' হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু গবেষকরা প্রমাণ করলেন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই দুর্যোগগুলো ঘন ঘন সংঘটিত হওয়ার ও ধরন পাল্টানোর সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরতদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দুর্যোগের সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ১৯৯৮ সালে দুর্যোগের সমাজবিজ্ঞান কোর্সটি সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই শুরু করেছি। পাশাপাশি পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান কোর্সটির পাঠদান করতাম।
আমার সহকর্মী 'সামাজিক বনায়ন' কোর্স চালু করলেন একই সময়ে। ২০০৭ সালে আমরা তিনজনে 'পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান' বইটি রচনা করলাম; এর প্রথম সংস্করণ নিমেষেই সবার কাছে আদৃত হলো। বোঝা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ ও দুর্যোগের আদিকল্প পরিবর্তনে বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে দেশব্যাপী আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সরকারের সেই প্রশিক্ষণ প্রকল্পে সমন্বয় হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠিত 'সেন্টার অব ডিজাস্টার অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ' (সিডিভিএস) ২০১২ সালের জুন মাসে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবর্তিত হলো 'ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ' নামে। এই ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা সরকারি-বেসরকারি ও বৈশ্বিক পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অনুষদে আরও একটি বিভাগ কাছাকাছি সময়ে 'দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি এই বিভাগের নামের আগে 'জলবায়ু পরিবর্তন' সংযুক্ত হয়েছে সময়োপযোগী করার জন্য। অন্যান্য বিভাগ, ইনস্টিটিউটে পরিবেশ ও দুর্যোগের ওপর বিভিন্ন কোর্স রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও দুর্যোগ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এ ছাড়াও গবেষণা করছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে। তিন দশক ধরে দুর্যোগ বিষয়ে গবেষণা ও অবদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত জেন্ডার ও ডিজাস্টার নেটওয়ার্কের পুরস্কার অর্জন করেছি ২০১৬ সালে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন থেকে 'ভিজিটিং প্রফেসর' সম্মান পেয়েছি। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলে বিশেষজ্ঞ স্বীকৃতি পেয়েছি। এগুলো আমার বড় অর্জন নয়; সবচেয়ে বড় অর্জন আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি পাচ্ছে।

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×