কভিড-১৯
জীবন ও জীবিকার সমন্বয় সাধনেই সমাধান
আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২১ | ১৪:৫৯
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফ্যামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর বিশ্বে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে পড়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় গুণ। সদ্য প্রকাশিত 'দ্য হাঙ্গার ভাইরাস মাল্টিপ্লাইস' শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, বিশ্বে করোনায় রোজ যত মানুষ মারা যাচ্ছে, এর চেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে ক্ষুধায়। করোনায় যেখানে মিনিটে সাতজনের মৃত্যু হচ্ছে, সেখানে ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে ১১ জন। এখন প্রশ্ন- সমাধান কোন পথে?
করোনা মহামারি থেকে মানুষকে বাঁচানোর উপায় খোঁজা হচ্ছে দুই বছর ধরে। এ নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। করোনা সংক্রমণ রোধে যে লকডাউন দেওয়া হচ্ছে, এতে জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য থাকছে না। এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের তাবৎ বাঘা দেশ। তাই জীবন ও জীবিকা বাঁচানো- এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে পড়ে ইতোমধ্যে অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে পড়েছে। কী উপায় আছে আমাদের সামনে? স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কিংবা টিকা নেওয়াই কি উপযুক্ত সমাধান? কিন্তু টিকা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার পরও তো মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। পুরো বিষয়টা নিয়ে গবেষণা চলছেই।
আমাদের দেশের সরকার নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে ১৫ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করে ঘরে বসিয়ে লকডাউন কি কার্যকর করা যায়? এ বিষয়টি অনেকেই বলছেন, কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই লকডাউন, কঠোর লকডাউন, সর্বাত্মক লকডাউন ইত্যাদি কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো সুফল মিলছে না। ধনী দেশগুলো দফায় দফায় নাগরিকদের সহায়তা দিয়ে লকডাউন বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ওই দেশগুলোও তেমন ইতিবাচক সুফল পায়নি। এখন তারা সবকিছু চালু করে দেওয়ার কথা ভাবছে। এতে ফলাফল যে আরও ভয়াবহ হবে, তা আঁচ করা যায়।
সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেল, দেশে নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সমাজ বা ব্যক্তিজীবনে কিছু ঘটলে, আয়ের উৎস সামান্য বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হলে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। কারণ তারা একেবারে প্রান্তিকে অবস্থান করে। দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে তাদের কোনো পরিবর্তন আসে না।
করোনার কারণে আয়ের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে এক শ্রেণির মানুষ পর্যায়ক্রমে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সাধারণত এই শ্রেণির মানুষের হাতে সঞ্চয় থাকে না। বর্তমানে তারা ধারদেনা করে কোনোমতে জীবিকা চালাচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্যাকেজে থাকা সত্ত্বেও এ অর্থ সবার কাছে যায়নি। এরই মধ্যে আরেকটি নতুন প্যাকেজ কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি খাতের জন্য ঘোষিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে যেন প্রণোদনার অর্থ যায়, তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য ক্ষুদ্রশিল্পে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো টাকা আদায়ের ব্যাপারে সংশয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি সুদ প্রণোদনা ছাড়াও মূলধনের কিছুটা রিস্ক বহন করে তবে ব্যাংকগুলো এ ধরনের ঋণ দিতে উৎসাহী হতে পারে। মানুষের কাছে টাকা যাওয়াটাই এখন বড় সমাধান। বেকার মানুষের হাতে নগদ টাকা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিন। ব্যবসায়ীদের জন্য রিলিফের চেয়ে প্রণোদনা অনেক ভালো। তারা ব্যবসাটা যেন চালিয়ে যেতে পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তা না করে ঢালাও লকডাউন দিলে লাভ হবে না।
করোনা মহামারি হয়তো এক সময় দূর হবে, কিন্তু সমাজ-জীবনে যে ক্ষত হচ্ছে, তা শুকাতে কতদিন লাগবে, বলা মুশকিল। ১৯৩০ সালের মহামন্দার প্রভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত গড়িয়েছিল। করোনার প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন কাম্য, তেমনি সামাজিক ক্ষত যেন দীর্ঘকাল বয়ে বেড়াতে না হয়, সে ব্যবস্থাও নিতে হবে। এই ব্যবস্থা হলো জীবন ও জীবিকার সর্বোচ্চ সমন্বয়।
এদিকে নতুন ভ্যারিয়েন্টকে নিষ্ফ্ক্রিয় করার ব্যাপারে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ, প্রশ্ন। আবার ভ্যাকসিনের জোগান নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাহলে আমাদের বাঁচার উপায় কী? আপাতত একটাই উপায়- স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। হয়তো কিছুদিন ক্ষুধা এবং মহামারি দুটোকেই সঙ্গে নিয়ে বাঁচতে হবে। দুটোই আমাদের অগ্রাধিকার। একটা ছেড়ে দিলে আরেকটা আমাদের বিপর্যস্ত করে ফেলবে। নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব অনেক বেশি। সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলে মহামারি আর ক্ষুধা- কোনোটাই আমাদের রেহাই দেবে না।
ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্নেষক
- বিষয় :
- কভিড-১৯
- আনোয়ার ফারুক তালুকদার