ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধ

ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের অবদান মনে রেখেছি?

ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের অবদান মনে রেখেছি?
×

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২২ | ১৭:১৮

ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ফরেন সার্ভিস দিবস উদযাপিত হলো ১৮ এপ্রিল। আয়োজক ছিলেন প্রশিক্ষণরত ফরেন সার্ভিস ক্যাডারের তরুণ সদস্যরা। ব্যবস্থাপনা ছিল অপূর্ব। এককথায় বলা চলে, এস্টেট অব দ্য আর্ট ব্যবস্থাপনা। আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদের সৌজন্যে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। একাডেমিতে যে সুমধুর অভ্যর্থনা পেয়েছি, সরকারি দপ্তরে এত বিনয়ী অভ্যর্থনা বিরল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন সিঙ্গাপুর থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। যেসব সাহসী কূটনীতিক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, মন্ত্রী তাদের বিশেষভাবে স্মরণ করেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন নির্বাচিত জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা একত্রিত হয়ে গণপরিষদ গঠন করেন। উল্লেখ্য, '৭১-এর ২৬ মার্চের প্রথম লগ্নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং আপামর জনসাধারণকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। এরই আলোকে নবগঠিত গণপরিষদ স্বাধীনতার সনদপত্র ঘোষণা করে এবং তা কার্যকর হয় ২৬ মার্চ থেকে, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার তারিখে। ওই সনদপত্রে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের রূপরেখা, ক্ষমতা এবং দায়িত্ব বর্ণিত হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১, বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর নামক মুক্তস্থানে শপথ নেওয়া হয়। ওই সরকারকে মুজিবনগর সরকার কিংবা অস্থায়ী সরকার বলা ভুল।

'৭১ এর ১৮ এপ্রিল কলকাতায় তৎকালীন পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশন অফিসে কর্মরত ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলীর নেতৃত্বে সেখানে ৬৫ কর্মরত কূটনীতিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ভবনের দখল নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড্ডয়ন করা হয়। ওই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে এই দিনটিকে ফরেন সার্ভিস দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। এরপর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, দূত ওয়ালিউর রহমান, লন্ডন হাইকমিশনে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লুতফুল মতিন এবং '৭১-এ লন্ডন হাইকমিশন অফিসের কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমেদ স্মৃতিচারণ করেন। তারা সবাই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন। মহিউদ্দিন আহমেদ জানালেন, বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার আগে ৮ এপ্রিল দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দু'জন বাঙালি কে এম শাহাবুদ্দিন এবং আমজাদুল হক পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে অসীম দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। মহিউদ্দিন ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন আমজাদুল হক স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, অথচ মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র দেওয়া হয়নি। বর্তমান সংসদে পাসকৃত আইন অনুযায়ী এই সনদপত্র আমজাদুল হকের অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মোটেই আমলে নিচ্ছে না বিষয়টি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১২০ জন কূটনীতিক এবং অন্যান্য কর্মকর্তা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। তবে অভিজ্ঞতা এ কথাও বলে, জনমত যতই সৃষ্টি করা হোক না কেন, একটি রাষ্ট্র ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার রাষ্ট্রের জন্য যা ভালো মনে করে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কথাটা এজন্য বলছি, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর জয় যখন অনিবার্য হয়ে উঠল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব আনল পাকিস্তান-ভারতের। মূল সমস্যা হলো, তাতে বাংলাদেশের নাম ছিল না। অথচ যুদ্ধটা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছিল ১০৪। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে ভারতের সঙ্গী যুগোস্লাভিয়া, মিসর, ঘানা এবং ইন্দোনেশিয়া ভারতের পক্ষে ভোট দেয়নি। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে। কেননা পাকিস্তান আরেকবার সুযোগ পেলে বাঙালির কী হাল হতো তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে, আর সে সুযোগ তারা পেত যদি বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হতো।

বহু দেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগতভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছিলেন। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কথা বলতে চাই। রাশিয়ার এই আক্রমণ অন্যায়, জাতিসংঘের সনদবিরোধী। তবে ইউক্রেনের কপাল ভালো যে, এর অবস্থান ইউরোপে। তাই যুদ্ধের আভাস পাওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং গোটা ইউরোপ অস্থির হয়ে উঠেছে। সামরিক, আর্থিক, মানবিক সব রকমের সাহায্যপ্রবাহও ইউক্রেনমুখী। পোল্যান্ডের এক গ্রামের নাম রাখা হয়েছে ইউক্রেনের এক শহরের নামে। আর যত রকমের অবরোধ সম্ভব চাপানো হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল কোন অপরাধে। বারবার প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম বললেন, তার কাছে মানববিধংসী অস্ত্র নেই। তারপরও আক্রমণ করা হলো, সাদ্দামকে গ্রেপ্তারের পর তাকে চরম নির্মমতার মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। ঈদের দিন ফাঁসি দেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো মারণাস্ত্র পাওয়া গেল না। ইরাকের ওপর যখন গোলাবর্ষণ করা হয়েছিল, তখন কি মৃত্যু হয়নি নিরপরাধ জনসাধারণের? বুশ-ব্লেয়ার ভুল হয়েছে বলেই খালাস পেয়ে গেলেন! ফিলিস্তিনিদের কথা আর নাই-বা বললাম। ফিলিস্তিনি শিশুর জন্মই হয় বেয়নেট-বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার জন্য। এর জন্য পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের কোনো ছটফটানি নেই। শুরুতে বলেছি, ভূরাজনৈতিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভেসে উঠছে মানসপটে।

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ: প্রথম বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা; শেয়ারবাজার, ব্যাংক ও বীমা খাত বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×