প্রতিবেশী
বিলকিস বানুর কাঠগড়ায় বিজেপির ভারত
মহুয়া মৈত্র
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০
বিলকিস বানুর ধর্ষক এবং তার পরিবারের খুনিদের ফুলের মালা দিয়ে বরণের দৃশ্য সবাই দেখছেন। কেন্দ্রীয় সরকার অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ; আর জনগণ বিজেপির ঘৃণ্য প্রচারণা গিলছে যে ওই ১১ জন দণ্ডিত ব্যক্তি, যাদের এখন বীর হিসেবে বন্দনা করা হচ্ছে- ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গুজরাট সরকারের কিছুই করার ছিল না। কারণ সুপ্রিম কোর্টই এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বাস্তবে আদালত শুধু কোনো অপরাধে ১৪ বছর সাজা খাটা ব্যক্তির দণ্ড মওকুফের পদ্ধতির কথা বলেছিলেন। আদালত বলেননি- বিলকিসের ধর্ষকদের ছেড়ে দিতে হবে। আদালত বলেছিলেন, এ ধরনের কোনো দণ্ডিত ব্যক্তিকে শুধু সরকারই মুক্তি দিতে পারে।
বিজেপির গোয়েবলসীয় দ্বিচারিতার সঙ্গে আমরা যারা ভালোভাবে পরিচিত, তাদের জন্য বিষয়টা নিশ্চয় আশ্চর্যজনক কিছু নয়। তারপরও এ ঘটনা একটু অন্য রকম লাগছে। ভয়ংকর সেই ঘটনাগুলো স্মরণ করুন; একজন অন্তঃসত্ত্বা তরুণীকে তার মায়ের সামনে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হলো। তারপর তাকে দেখতে বাধ্য করা হলো তারই মা ও দুই বোনের একই পরিণতি। এর পর তার ৩ বছরের মেয়েটার মাথা মেঝেতে আছড়ে তার সামনেই মেরে ফেলা হলো। মনে রাখবেন, এগুলো কিন্তু আদালতে প্রমাণিত সত্য এবং সংস্কারি ব্রাহ্মণরা সেখানেই এর দায়ে দোষী প্রমাণিত হন। দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ সংঘটনের দায়ে আদালত ওই ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সংঘ (আরএসএস) পরিবারের সবচেয়ে নিষ্ঠাবান সদস্যটিও এ নিয়ে বিতর্ক তুলতে পারবেন না। আমার প্রশ্ন- যে দেশে গড়ে ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার ঝুলে থাকে; বিচারাধীন আসামি বছরের পর বছর চার্জশিট ছাড়াই জেলে পচে মরে; বিলকিসের ধর্ষকদের চেয়ে অনেক হালকা অপরাধ সংঘটনের দায়ে মানুষ যাবজ্জীবনের নামে ৩০-৪০ বছর জেল খাটে; কোনো সাজা মওকুফের সুযোগ পায় না, সেখানে ওই ১১ জন জেল থেকে বের হয় কীভাবে?
বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। তবে এ ঘটনায় মুসলিমদের প্রতি হিন্দুত্ববাদী দলটির বিশেষ ধরনের এক ঘৃণা ফুটে উঠেছে; নারীর প্রতি তাদের সহজাত অশ্রদ্ধাও বেরিয়ে এসেছে। এটাও বলা যায়, বিজেপি চরমভাবে বিশ্বাস করে- আইনকানুনের কোনো প্রয়োজন নেই। দলটি প্রতিটি ঘটনা থেকে নির্বাচনী সুবিধা পেতে চায়। আমাদের জন্য তা দুর্ভাগ্যজনক হলেও, এখানেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। এর মাধ্যমে বিজেপি পোলোনিয়াসের সেই বাণীরই যেন পুনরাবৃত্তি করল :জিনিসটা মন্দ হলেও এতে একটা প্রক্রিয়া আছে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়েই বিজেপি সুপ্রিম কোর্টকে মুখোশ বানিয়ে বোঝাতে চাইল- আদালতই আসলে একভাবে তাকে বিলকিসের ধর্ষকদের ক্ষমা করে দিতে বাধ্য করেছেন।
দণ্ড মওকুফ একান্তই নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার। ১৯৭৬ সালে মধ্যপ্রদেশ বনাম রতন সিং মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টা খোলাসা করে দিয়েছেন। ওই রায়ে আদালত বলেছেন- ক্ষমা, দণ্ড মওকুফ ও হ্রাস পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের বিষয়। অতএব, আদালত নয় বরং নির্বাহী মেশিনারি- আরও স্পষ্ট করে বললে বিজেপি নেতৃত্বাধীন গুজরাট সরকার ওই ধর্ষক ও খুনিদের দেওয়া শাস্তি কমিয়ে দিয়েছে। এ সরকারের ওই মন্দ প্রক্রিয়া অনুসরণের আরেকটা প্রমাণ হলো, এরা বিলকিসের ধর্ষকদের বেলায় ১৯৯২ সালের দণ্ড মওকুফ পলিসি ব্যবহার করেছে। এ বিষয়ে ২০১৪ সালে তৈরি একটা পলিসি আছে, যেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের মতো অপরাধকে এ সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে এর মানে এই না যে, ১৯৯২ সালের পলিসিতে বলা আছে- এ ধরনের গুরুতর অপরাধকারীরা দণ্ড মওকুফের আবেদন করলেই তাতে সাড়া দিতে হবে। উপরন্তু, দণ্ডবিধির ৪৩৫ সেকশনে স্পষ্ট করে লেখা আছে, দিল্লি স্পেশাল পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে এজেন্সিগুলো কোনো মামলা তদন্ত করলে রাজ্য সরকারগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। বিলকিসের অত্যাচারকারীদের দণ্ড দিয়েছেন সিবিআই আদালত। কিন্তু কোনো প্রমাণ কি আছে- ওই অপরাধীদের দণ্ড মওকুফের আগে গুজরাট সরকার কেন্দ্রের কোনো পরামর্শ নিয়েছে? তেলেঙ্গানা স্টেট বনাম ড. কৃষ্ণ কুমার মামলায় হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, দণ্ড মওকুফের আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সংশ্নিষ্ট আদালতের বিচারকের সঙ্গে, যেখানে ওই দণ্ড দেওয়া হয়েছে, অবশ্যই পরামর্শ করবেন। আলোচ্য ইস্যুতে গুজরাট সরকার এমন কোনো পরামর্শ নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
যে প্যানেল বিলকিসের ধর্ষকদের দণ্ড মওকুফ করেছে, তার অর্ধেক সদস্য সরাসরি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। দু'জন বিজেপির বিধায়ক; একজন বিজেপির নেতা এবং আরেকজন দলটির রাজ্য কমিটির সাবেক নেতা। অন্যদের মধ্যে জেলা কালেক্টর, পুলিশের এসপি ও জেল সুপার সরাসরি রাজ্য সরকারের কর্মচারী। অতএব প্রক্রিয়াটা পরিস্কার।
এভাবে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়ে দিলে সমাজেই বা এর কী প্রভাব পড়বে? একদিকে অপরাধীরা নিজেদের আইন-আদালত সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করবে এবং তার অবধারিত ফল হিসেবে বারবার অপরাধে জড়াতে উদ্বুদ্ধ হবে। আরেক দিকে ভুক্তভোগীরা অসহায়ত্ব বোধ করবে; আইন-আদালতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। মোট কথা, সমাজ নিপতিত হতে পারে এক ধরনের নৈরাজ্যের মধ্যে।
সব জঘন্য অপরাধের বেলায় যেমনটা দেখা যায়; সাধারণত দর্শকরাই চূড়ান্ত জয় পায়, অপরাধীরা নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিলকিস, তাঁর মেয়ে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ভারতীয়রা মনে হচ্ছে যৌথ অপরাধ সংঘটনকারীর পরিচয়ে পরিচিত হতে যাচ্ছে। আমরা যারা এ ১১ জন অপরাধীর অপরাধকে লঘু, গুরু, মাঝারি ইত্যাদি বর্গে ফেলে বিচারের চেষ্টা করছি; তাঁদের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে, যে অপরাধ বিলকিস, তাঁর মেয়ে ও তাঁর পরিবারের ওপর হয়েছে; তার চেয়ে জঘন্য কিছু হতে পারে না।
৩ বছরের একটা মেয়ের খুনিদের, তার মা-খালাদের ধর্ষকদের জেল থেকে বের করে এনে তাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে নাচানাচি করা একটা জঘন্য ধরনের কাজ। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, বিশেষ করে বিজেপির সেসব লোক এই 'সংস্কার'-এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; যে কালী বলে একজন অনার্য দেবী আছেন; যাঁর ডানা আছে, জিহ্বা বের করা এবং পা ওপরে তোলা; তিনি কিন্তু প্রত্যাঘাত হানবেন। দিল্লিতে ২০১২ সালে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে যে তরুণীটি মারা গিয়েছিল, সে কিন্তু মৃত্যুর পরও ভারতের নৈতিকতার জালকে শক্ত করেছিল। বিলকিসও শোকে স্তব্ধ হয়ে আমাদের একই ক্রিয়ায় উদ্বুদ্ধ করবে।
মহুয়া মৈত্র :তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ভারতের লোকসভার সদস্য; দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন
- বিষয় :
- প্রতিবেশী
- মহুয়া মৈত্র