ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

কুইনাইন সারাবে কে?

কুইনাইন সারাবে কে?
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০

সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী কৌতুকার্থে বলেছিলেন- কুইনাইন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে? সময়ের ব্যবধানে প্রায় প্রবাদে পরিণত হওয়া সেই বাক্য খোদ চিকিৎসা খাতেই ক্রমে কঠিন বাস্তব হয়ে উঠেছে। আর তা শুধু বাংলাদেশে নয়; বিশ্বজুড়েই। যে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা 'পেশেন্ট সেফটি ডে' বা রোগীর নিরাপত্তা দিবসের প্রচলন করেছে। অর্থাৎ, রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ সেবন করতে গিয়ে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করা জরুরি। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে এ চিত্র আরও প্রকট বিবিধ কারণে। যেমন চিকিৎসকের ঔদাসীন্য ও অবহেলা, তেমনই ওষুধ সেবনকারী বা তাঁদের স্বজনের অসচেতনতায় এক রোগ নিরাময় করতে গিয়ে অপর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
স্বীকার করতে হবে- দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষত গত এক যুগে অনেক অগ্রগতি ঘটেছে। এখানে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিকিৎসাপ্রাপ্তির জন্য যেমন বড় বড় হাসপাতাল রয়েছে, তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসার জন্যও হাসপাতাল-ক্লিনিকের সংখ্যা কম নয়। আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এখন শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে অনেকাংশে গ্রামের মানুষও এ সেবা পান। ইউনিয়ন পর্যায়ে সারাদেশে সরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। তবে হতাশার বিষয় হলো, চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার এত বিস্তার সত্ত্বেও দেশে সব রোগীই নিরাপদ চিকিৎসা পাচ্ছেন- এমনটা দাবি করা যাবে না। চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুলের কারণে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা এখানে মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকে। ভুল, এমনকি ভেজাল, ওষুধ খেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও এখানে বিরল নয়। আর ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সারাদেশে প্রতি বছর কত রোগী সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন, তারও কোনো সঠিক হিসাব নেই। এখানে একদিকে ওষুধ উচ্চমূল্যে কিনতে হয়, অন্যদিকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া যত্রতত্র ওষুধ বিক্রি হয়। তবে আশার বিষয় হলো, বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রোগীদের এ নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি শুধু অনেক চিকিৎসককে নয়; আমাদের স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদেরও ভাবাচ্ছে। এরই আভাস পাওয়া গেল বিশ্ব রোগীর নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে সমকাল ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায়। রোববার অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় বক্তারা রোগীর সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা অনিরাপদ হয়ে ওঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
আমরা দেখছি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে। নকল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের লক্ষ্যে ঔষধ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগেও মাঝেমঝ্যে অভিযান চলে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, অনিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধের বিরুদ্ধে সরকারি এসব অভিযান বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে চালালে কোনো সুফল আসবে না। অভিযান হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন এবং কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই। একই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থা, ওষুধ উৎপাদন, এমনকি সেবনের মাত্রায়ও নজর দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্বীকৃত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধের বিষয়টিও যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- ভুলে যাওয়া চলবে না। এ ব্যাপারেও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক গোলটেবিলে যে বার্তা দিয়েছেন, সংগত কারণেই তা সাধুবাদ পেতে পারে।
বস্তুত আমাদের কর্তাব্যক্তিরা যদি মনে রাখেন যে- নিছক স্বাস্থ্যসেবা নয়, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা হলো মানুষের মৌলিক অধিকার; তাহলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান সহজ হয়ে যায়। আমরা জানি, আশির দশক থেকে অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতেও নয়াউদারতাবাদ, যেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলোও বাজারের পণ্যে পরিণত করা হয়- অনুসরণ করতে গিয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণের নীতি কার্যকর করা হয়। এর সুযোগ নিয়ে দেশের আনাচেকানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে ওঠে। ওষুধ উৎপাদন পরিস্থিতিও তথৈবচ। স্বাস্থ্যসেবা খাতে দৃশ্যমান নৈরাজ্য যে এরই ফসল- বললে অতিরঞ্জন হবে না। আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে; একই সঙ্গে সচেতন নাগরিকরাও এ বিষয়ে সোচ্চার হবেন।

আরও পড়ুন

×