সমকালীন প্রসঙ্গ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থায়ী উদ্যোগ জরুরি
মুশতাক হোসেন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০
ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসের চারটি ধরন রয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে ৪ নম্বর ভাইরাস। ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল ১ নম্বর ধরন দিয়ে, পরে ২ নম্বর। এর পর তৃতীয় ধরনটি যখন আঘাত হানে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে চতুর্থ ধরনটি ছড়িয়ে পড়েছে। এটি তৃতীয় ধরনের চেয়েও ভয়াবহ। যে কারণে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি। যাঁরা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়েছেন; এখন নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন; তাঁদের জন্য ঝুঁকি বেশি। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ দফায় আক্রান্ত অনেকেরই মৃত্যু হচ্ছে অথবা মুমূর্ষু অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
২০১৯ সালে আমাদের দেশে ডেঙ্গু জ্বরে অনেকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবারও নতুন করে ভাইরাসটি চোখ রাঙাচ্ছে। তবে তখন ছিল ৩ নম্বর ধরন। এখন যেহেতু ৪ নম্বর ধরন, তাই আগের তুলনায় বেশি সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যাঁরা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের ব্যাপারে বেশি যত্নবান হতে হবে। তবে যাঁরা প্রথমবার আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের জন্য বেশি ঝুঁকি নেই। তাই বলে এটিকে অবহেলা করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু হলে রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমতে থাকে। তাই রোগীর প্রতি সামান্য অবহেলা বড় ধরনের ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। এটা হতে হবে সমন্বিত। অস্থায়ী উদ্যোগ নিয়ে এ সমস্যার ভালো সমাধান আশা করা যায় না। যাতে ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা বংশবিস্তার করতে না পারে সে জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করতে হবে। এখানে শুধু সিটি করপোরেশন বা অন্য কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না; নিজ উদ্যোগে বাসাবাড়ির ছাদ ও আঙিনা পরিস্কার রাখতে হবে। ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন আর শুধু ঢাকা মহানগরীতে সীমাবদ্ধ নেই। উপজেলা পর্যায়ে এমনকি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। পাকা রাস্তার পাশের গর্তেও এ মশা জন্মাচ্ছে। তাই সারাদেশেই এডিস মশার বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়; ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতায়ও এক সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল। তারা কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে এটি সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে। ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরের দৃষ্টান্তও আমরা অনুসরণ করতে পারি। ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতে ডেঙ্গু এত ভয়াবহ নয়। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ মহামারি। তাই এর মোকাবিলা আমাদেরই করতে হবে। কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা বা মশার লার্ভা নিধন অস্থায়ী সমাধান। এসব দিয়ে সাময়িক উপকার হলেও স্থায়ী সমাধান হবে না। যদি সঠিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া যায়, তাহলে এ মহামারি মোকাবিলা করা সম্ভব। তা না হলে প্রতিবছরই এর মুখোমুখি হতে হবে।
সিটি করপোরেশন এডিস মশাসহ অন্যান্য মশা নিধনে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসছে না। ঘরে ঘরে গিয়ে সিটি করপোরেশন মশা মারতে পারবে না। তারা সড়ক ও গলিতে অভিযান চালায়। তাই জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তখন তারাই মশার উৎস খুঁজবে এবং তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে। তবে নিজেরা সচেতন না হলে সিটি করপোরেশন সমাধান দিতে পারবে না। কারণ তারা মাঝেমধ্যে অভিযান চালায়; ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানা করে। কিন্তু এতে সমাধান আসছে না। ইচ্ছে করলেই সব বাসাবাড়িতে অভিযান পরিচালনা সম্ভব নয়। জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা সামনে এসে হাজির হয়।
এখন যেহেতু প্রায় ঘরেই ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই কারও জ্বর হলে প্রথমেই করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। কারণ দেশ থেকে এখনও মহামারি করোনা শেষ হয়ে যায়নি। বরং নতুন করে অনেকে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুও হচ্ছে। তাই জ্বর হলে শুরুতে কভিড-১৯ হয়েছে কিনা, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। এর পর ডেঙ্গু হয়েছে কিনা তার পরীক্ষা। যদি করোনা ও ডেঙ্গু কোনোটাই না হয়ে থাকে তখন ধরে নিতে হবে এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য কোনো ভাইরাসজনিত জ্বর। এ অবস্থায়ও নিজেকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কারণ তখন অন্যের সংস্পর্শে গেলে এ জ্বরে আরেকজন আক্রান্ত হতে পারে। এরই মধ্যে যাঁরা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শে চলা। যাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার তাঁদের ডাক্তাররা ভর্তি করবেন। অন্যদের বাসায় থেকে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলতে হবে। যেহেতু ডেঙ্গু জ্বর শরীরে প্লাটিলেট ধ্বংস করে দেয় তাই যে কোনো সময় প্লাটিলেট নেওয়ার দরকার হতে পারে। এ জন্য পরিচিতজনের মধ্যে রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে দাতা প্রস্তুত রাখতে হবে।
করোনা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে- স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অবহেলা নয়। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দে কার্পণ্য করা যাবে না। স্বাস্থ্য ঠিক থাকলে সব ঠিক। দেশে এখন করোনা, ডেঙ্গু ও চোখ ওঠা রোগের প্রকোপ চলছে। এসব রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যেন চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে না যায়। করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ রোধে এডিস মশা আর মানুষের মাঝে দেয়াল তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ আমরা যদি মশা এবং মানুষের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারি, তাহলে সমাধান আসবে। এ প্রতিবন্ধকতা হতে পারে দিন-রাত মশারি টানিয়ে ঘুমানো, পরিবেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে সময় ক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। এডিস মশা কোথায় বংশবিস্তার করে, এসব নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে কীটতত্ত্ববিদদের সঙ্গে বসতে হবে। স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে কাজ করলে সমাধান দ্রুত ও বাস্তবমুখী হবে। দরকার হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় উদ্যোগ নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার খোলা দরকার হলে তাও করতে হবে।
ডেঙ্গু এবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আগামীবার নেবে না- বিষয়টি এমন নয়। বরং বেশ কয়েক বছর ধরে প্রতিবছরই এই সময়ে এসে ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আগামীবার এটি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অভিজ্ঞতায় তাই তো দেখছি। ধরন পরিবর্তন হয়ে এটি বেশি ঝুঁকি ডেকে আনছে।
ডা. মুশতাক হোসেন :রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)
