ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নগর পরিকল্পনা

বৈষম্য ভুলে গড়ি বাসযোগ্য নগরী

বৈষম্য ভুলে গড়ি বাসযোগ্য নগরী
×

নীলোপল অদ্রি

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

আজ পালিত হচ্ছে 'বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস'। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য 'থিঙ্ক গ্লোবাল, প্ল্যান লোকাল'। এর ভাবার্থ এমন- 'বৈশ্বিকভাবে চিন্তা করি, স্থানীয় পরিকল্পনা করি।' প্রকৃত অর্থেই বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে বৈশ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সে অনুযায়ী আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নগর পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
আমাদের মৌলিক চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বাসস্থান। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ নগর, যেখানে নগরায়ণ ও অভিবাসনের হার বেশি, সেগুলো বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনও নগরের বাসযোগ্যতা অনেকাংশে প্রভাবিত করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে। আর বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই নগরী অভিঘাতগ্রস্ত বাস্তুহারাদের ঠাঁই দিতে গিয়ে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিপুলসংখ্যক বাস্তুহারা জনগোষ্ঠী জলাভূমি ভরাট করে বসতি বা 'বস্তি' গড়ে তুলছে। সেখানে মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো শুধু কষ্টকরই নয়; অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বর্জ্য ও পয়ঃনিস্কাশন, খাবার পানি, স্বাস্থ্য প্রভৃতি অব্যবস্থাপনা এবং চাহিদার সঙ্গে জোগানের খাপ খাওয়াতে না পারা ঢাকা শহরকে কম আয়ের মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।
এ ক্ষেত্রে সমাধান দিতে পারে উপযুক্ত নগর পরিকল্পনা। আর নগরের বিশাল জনগোষ্ঠী যেহেতু দরিদ্র এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ বাস্তুহারা অভিবাসী, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী; তাদের বিশেষ চাহিদা মাথায় রেখে এবং একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।
নগর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক কঠিন। বিশেষ করে গ্রাম থেকে শহরের দিকে অভিবাসীর ঢেউ পরিকল্পনা পেশাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। মূলত রাজউক ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, এলজিইডি, স্থানীয় সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত। এসব খাতেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনেক পৌরসভায় এখনও মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয়নি এবং যেসব পৌরসভা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে; তা সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত না হওয়ায় পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিধিবিধান প্রয়োগ বা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কোনোটিই সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট মেয়রের সদিচ্ছা এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের উদ্যোগ কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে আরও বেশি নগর পরিকল্পনাবিদের পদ তৈরি করা প্রয়োজন।
বর্তমানে অনেক পৌরসভায় নগর পরিকল্পনাবিদ ছাড়াই মাস্টারপ্ল্যানের কাজ চলছে, যা দুঃখজনক। প্রকৌশলী, স্থাপত্যবিদ এবং পরিকল্পনাবিদের সমন্ব্বয়ে একটি দক্ষ টিমের পক্ষেই প্রকৃত পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্ভব। বিষয়টি স্থানীয় সরকার এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা পরিকল্পিত নগর গড়তে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হলে ঢাকা শহর এবং এর আশপাশের শহরতলির পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের আবাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ড্যাপে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সুলভ আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য এই প্রথম শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রণোদনা 'এফএআর' করা হয়েছে যেন মানুষ ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি ফ্ল্যাট ক্রয়ের সক্ষমতা অর্জন করে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার লক্ষ্যে সম্ভাব্য ৫৮টি লোকেশন পরিকল্পনায় চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে নূ্যনতম সুদহার (২ দশমিক ৫ শতাংশ-৩ শতাংশ) ও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে (২৫-৩০ বছর) অর্থাৎ সহজ শর্তে ঋণ জোগানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
একটি ভালো পরিকল্পনার পূর্বশর্ত হচ্ছে পরিকল্পনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যেমন আরডিএ বা রাজউক 'রিস্ক সেনসিটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান' করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এটি মনে রাখা প্রয়োজন, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ঢাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি শহর, যা কয়েক দশক ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা প্রত্যক্ষ করছে। এ ছাড়া ভরাট হয়ে যাওয়া জলাভূমিগুলো পুনরুদ্ধার অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হবে না বিধায় ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে বড় শহরগুলোতে যথাযথ 'ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
এসব বিষয়ে যেসব 'গ্যাপ' রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা যাক। প্রথমত, বাংলাদেশে কোনো নগর পরিকল্পনা নীতি বা আইন নেই। 'আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং অ্যাক্ট, ২০১৭' অনুমোদন পেলেও এখনও গেজেটভুক্ত নয়। সে কারণে এর প্রয়োগ এখনও শুরু করা যায়নি। দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতক পাস করে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পরিকল্পনা পেশায় সরাসরি যুক্ত থাকছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষকতাসহ অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছে। সরাসরি পরিকল্পনা পেশার সঙ্গে যুক্ত প্র্যাকটিশনারদের মধ্যেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় কার্যকরভাবে শতভাগ উদ্যম কেউই দিতে পারছে না।
আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো, মানুষকে অন্তর্ভুক্ত না করেই নগর পরিকল্পনা করার প্রবণতা। স্থানীয় পর্যায়ে নানারকম জনসম্পৃক্ত কমিটি থাকলেও প্রতিনিধিত্ব করেন মূলত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। অতিদরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখানে সহজেই বাদ পড়ে যায়। অতএব, সবাইকে নিয়ে সবার জন্য পরিকল্পনা করা এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া সমন্বয় বৃদ্ধির জন্য সব পরিকল্পনার ডিজিটাল ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা উচিত, যা পরিকল্পনার দ্বিরুক্তি রোধে সাহায্য করবে।
একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় 'সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল'-এসডিজি নির্ণয়ে আরও সচেষ্ট হতে হবে। এসডিজির ১১ নম্বর লক্ষ্য হচ্ছে, 'সাসটেইনেবল সিটিজ অ্যান্ড কমিউনিটিজ'। একটি শহর তখনই টেকসই হবে যখন এর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হবে। এই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে প্রয়োজন যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক, জলাধার এবং বিনোদনের ব্যবস্থা। এ ছাড়া দরকার অন্যান্য নাগরিক সেবা। যেমন- নিরাপত্তা এবং পরিসেবাগুলো ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব নগরবাসীর জন্য নিশ্চিত করা। নগরমুখী অভিবাসীর ঢেউ কমাতে যথাযথ গ্রামীণ পরিকল্পনা ও 'আমার গ্রাম আমার শহর'-এর মতো সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বৈষম্য ভুলে এসব সেবা সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে সব শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক আজকের বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসের অঙ্গীকার।
ড. নীলোপল অদ্রি: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েট

আরও পড়ুন

×