নগর পরিকল্পনা দিবস
জনস্বাস্থ্যবান্ধব নগরায়ণ কতদূর?
গোলাম শওকত হোসেন
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২২ | ০৮:০৯ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২২ | ০০:৪১
দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর দার্শনিক হিপোডাম্যাস পৃথিবীর প্রথম নগর পরিকল্পনাবিদ যিনি পেশায় একজন চিকিৎসকও ছিলেন। আধুনিক বিশ্বে প্রথম নগর পরিকল্পনার সুবিন্যস্ত পদ্ধতির প্রবর্তক হচ্ছেন স্যার পাটক্রিক জেডস, তিনি ব্রিটিশ এবং পেশায় জীববিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন। নগরায়ণের বিষয়ে এই দু'জনের চিন্তাধারায় কিন্তু একটি সাদৃশ্য ছিল সেটা হচ্ছে জীব তথা মানুষকে কেন্দ্র করে নগরায়ণের চিন্তাভাবনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিক নগরায়ণের ফলে পৃথিবী যখন চিমনির কালো ধোঁয়াতে আচ্ছাদিত হওয়া শুরু হয় এবং সবুজ বনাঞ্চল যখন উজাড়ের হুমকির সম্মুখীন হয় তখন ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী ইউনিভার্সিটি অব বুয়েন্স আয়ার্সের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর কার্লোস মারিয়া ডেলা পাউলেরা 'ওয়ার্ল্ড টাউন প্লানিং-ডে'-এর প্রবর্তন করেন যা নভেম্বরের ৮ তারিখে বিশ্বে পালিত হয়। তাদের প্রত্যেকের চিন্তাধারার প্রধান মূল স্তম্ভ চারটি- ১. স্বাস্থ্য ২. স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক ব্যবস্থা ৩. সৌন্দর্য এবং ৪. পরিবেশ।
২০২২ সালে সভ্যতার ১০ লাখ বছরের পর আজ পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি, সুতরাং পরিসংখ্যানের ধারা অনুযায়ী ২০৭৫ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯৫০ কোটি। এই পূর্বাভাস অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নগরায়ণের পরিকল্পনাকে কতগুলো স্তরে ভাগ করা হয়েছে- ১. মাস্টারপ্লান, ২. ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান, ৩. স্ট্রাকচার প্ল্যান, ৪. ডিস্ট্র্রিক্ট প্ল্যান এবং ৫. অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান। আবার প্রতিটি স্তরে চারটি করে ভাগ আছে, যথা-১. রিজিওনাল পল্গ্যান, ২. সাব-রিজিওনাল পল্গ্যান, ৩. সেক্টরাল পল্গ্যান এবং ৪. স্পাটিইয়াল প্ল্যান।
পৃথিবী যখন ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির সম্মুখীন, তখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনস্বাস্থ্যকে অটুট রাখা। আর এর পূর্বশর্ত হচ্ছে শস্য-শ্যামল পৃথিবীর যাতে বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয় সেজন্য সবুজায়নে নিরবচ্ছিন্ন সচেষ্ট থাকা, যাতে ইকোসিস্টেমের কোনো ক্ষতি না হয়। নগরায়ণে গ্রিন বেল্টের ব্যাপারে ১৯২০ সালে ইংরেজ আর্কিটেক্ট ও টাউন প্ল্যানার রেমন্ড আনুইন পরামর্শ দিয়েছিলেন। উন্নত বিশ্বের আর্কিটেক্ট ও টাউন প্ল্যানার এবং ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী আধুনিক সিটিগুলো আটটি জোনে বিভক্ত থাকতে হবে যথা- ১. রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া ২. পাবলিক এরিয়া ৩. পার্ক, ৪. ফ্যাক্টরি ও ইন্ডাস্ট্রি ৫. রাস্তা, ৬. জলাশয়, পুকুর, খাল বা নদী, ৭. অন্ডার গ্রাউন্ড স্যুয়ারেজ ও স্ট্রর্ম ওয়াটার ড্রেনজ এবং ৮. অন্ডার গ্রাউন্ড টানেল- ইলেক্ট্রিসিটি, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও গ্যাস সিস্টেমের জন্য।
এমন আবাসিক এলাকা তৈরি হবে যেখানে হাঁটার পথ থাকবে। কারণ, হাঁটার অভ্যাস থাকলে শরীর সুস্থ থাকবে। বাইসাইকেল চালানোর পথ থাকবে। স্বল্প দূরত্বে কাজ সারতে বাইসাইকেল চালালে শরীরের জন্য ভালো। তাতে অসুখ-বিসুখ কম হয়, এটি একটি ভালো ব্যায়াম। সিটি কারের পথ থাকবে এবং বাড়িগুলোতে ক্রস-ভেন্টিলেশন যাতে ফ্যান বা এসির ব্যবহার কম করতে হয়। সোলার পাওয়ারের ব্যবহার, গ্রিন জোন থাকবে। যেখানে ঘাস, ফুলের বাগান ও সবজি লাগানো হবে এবং নিজস্ব কার-পার্কিং থাকতে হবে।
অফিস, শপিং মল, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, হসপিটাল ও ফুডকোর্ট তৈরি হবে পরিকল্পিতভাবে, যেখানে থাকবে ক্রস-ভেন্টিলেশন। যাতে ফ্যান বা এসির ব্যবহার কম করতে হয়। সোলার পাওয়ার/সানলাইটের সর্বোচ্চ ব্যবহার, তাতে ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবহার কম হবে। গ্রিন জোন থাকবে। কারণ, গাছ দিনে অপিজেন ছাড়ে আর কার্বন ডাই-অপাইড গ্রহণ করে। ইমার্জেন্সি এপিট/ফায়ার সেফটি সিস্টেম থাকবে। অগ্নি দুর্ঘটনায় মানুষের জীবন রক্ষা পাবে ও ক্ষতি কম হবে এবং কার-পার্কিং থাকবে। যাতে রাস্তায় গাড়ি পার্ক করতে না হয়)। লিটারিংয়ে ও ওপেন স্মোকিংয়ে জিরো টলারেন্স।
পার্ক তৈরি হবে সাব-রিজিওনাল প্ল্যান অনুসারে, এই এরিয়াতে সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে ওয়াটার স্প্রিংলার চলবে আর স্প্রিংলারে ব্যবহার করা হবে ওয়েস্ট ওয়াটার (যাতে ফ্রেশ ওয়াটার কম খরচ হয়), রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত (কারণ এই সময় মানুষ থাকে না যাতে কিছুটা দুর্গন্ধযুক্ত এই পানি মানুষকে অস্বস্তি না দেয়, কিন্তু সবুজ গ্যাস বা গাছের জন্য উপকারী)। হাঁটার পথে হাঁটতে হবে ও ফ্রিহ্যান্ড এপারসাইজের জায়গায় ব্যায়াম করতে হবে কিন্তু ঘাসের ওপর জুতা পরে হাঁটা যাবে না (যাতে গ্রিন জোনের কোনো ক্ষতি না হয়)। লিটারিং, ওপেন স্মোকিংয়ে এবং যৌন হয়রানিতে জিরো টলারেন্স।
ফ্যাক্টরি তৈরি হবে রিজিওনাল প্ল্যান অনুসারে, এই এরিয়াতে সোলার পাওয়ার/রিসাইকেল এনার্জি এবং সানলাইটের ব্যবহার সর্বোচ্চ করতে হবে। ফ্যাক্টরি তৈরির শুরুতেই ইটিপি (যাতে কারখানার বর্জ্য কোনোভাবেই বাইরে না যায়) ও গ্রিন জোন তৈরি করতে হবে (পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য), ফ্যাক্টরির নিজস্ব বড় আকারের ওয়াটার রিজার্ভার থাকতে হবে (অগ্নি দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের যাতে পানির অভাব না হয়, মানুষের জীবনরক্ষা পাবে ও ক্ষতি কম হয়), ইমার্জেন্সি এপিট, ফায়ার সেফটি সিস্টেম এবং ডাক্তারসহ ইমার্জেন্সি মেডিকেল ফ্যাসিলিটি থাকতে হবে (তাতে মানুষের ইমার্জেন্সি চিকিৎসা হয় ও দুর্ঘটনায় কাজুয়ালিটি কম হয়)।
রাস্তা তৈরি হবে রিজিওনাল প্ল্যান অনুসারে, নগরের ২৫% রাস্তা থাকতে হবে, সবার জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সুবন্দোবস্ত থাকতে হবে (তাতে পার্সোনাল গাড়ি কম ব্যবহার হবে, ট্র্যাফিক জ্যাম কম হবে ও মানুষের সময় বাঁচবে), রাস্তার পাশে হাঁটার পথ, বাইসাইকেল চালানোর পথ থাকতে হবে (স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলোতে ৬০% মানুষ সাইকেল চালায় স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য) এবং রাস্তার পাশে ওয়াটারিং ফ্যাসিলিটিসহ গাছ থাকতে হবে (গ্রিন বেল্টের পরিচর্যার জন্য)। পরিবেশবান্ধব সোলার/ ইলেকট্রিক যানবাহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অনুমোদিত স্থান ছাড়া কারপার্কিং, ট্র্যাফিক রুল ভায়োলেশন, আনফিট যানবাহন চালানো, নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো ইত্যাদিতে জিরো টলারেন্স।
জলাশয়, খাল বা নদী ভরাট বা দখল করা, তাতে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা, লিটারিং ও ওপেন স্মোকিংয়ে জিরো টলারেন্স। প্রয়োজনে ড্রেজিং করতে হবে ও ওয়াটার ট্রান্সপোর্টের (যাতায়াত বা বিনোদনের জন্য) জন্য ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিং করলে এগুলো রিজার্ভার হিসেবেও কাজ করবে যা দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে রিফাইনের মাধ্যমে হাউস-হোলড বা ড্রিংকিং ওয়াটার হিসেবেও কাজ করা যাবে।
অন্ডারগ্রাউন্ড স্যুয়ারেজ ও স্ট্রম ওয়াটার ড্রেনেজ তৈরি হবে রিজিওনাল প্ল্যান অনুসারে; তবে এগুলোতে নন-ডিসপসেবল কোনো কিছুই ফেলা যাবে না। ধরা পড়লে বিরাট অঙ্কের ফাইন বা জেল হবে। তাহলে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু/ কোমরপানি রাস্তায় জমবে না, যা মানুষ/ যানবাহনের চলাচলকে বিঘ্নিত করে ও যার সংস্পর্শে এসে নানা চর্মরোগ হয়।
অন্ডার গ্রাউন্ড ওয়াটার, ইলেকট্রিসিটি, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও গাস সিস্টেমের জন্য টানেল তৈরি হবে রিজিওনাল প্ল্যান অনুসারে; তবে প্রত্যেক এরিয়ার জন্য মাস্টারপ্ল্যান থাকতে হবে যাতে বারবার রাস্তা খুঁড়তে না হয়। বারবার রাস্তা খুঁড়লে মানুষের দুর্ভোগ হয়, জনগণের প্রোডাক্টিভিটি কমে যায় এবং দেশের ক্ষতি হয়। জনস্বাস্থ্যবান্ধব নগরায়ণ মানুষ ও পরিবেশকে ভালো রাখবে এবং তাতে দেশের মানুষের ও দেশের প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে।
- বিষয় :
- নগর পরিকল্পনা
- গোলাম শওকত হোসেন
- নগরায়ণ
