ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রাজনীতি

নূর হোসেনের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে?

নূর হোসেনের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে?
×

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

নূর হোসেন ছিলেন সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এরশাদের অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ৯ বছরের লাগাতার সংগ্রামে সর্বস্তর ও শ্রেণির মানুষ অংশ নেয়। নূর হোসেনের মতো শ্রমজীবী-মেহনতি-বিত্তহীন মানুষের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা নিজ উদ্যোগে মহল্লা ভিত্তিতে সংগঠিত কিংবা কর্মস্থলে শ্রমিক সংগঠনভিত্তিক জমায়েত হয়ে দল বেঁধে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিত।
নূর হোসেন গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকা মিনিবাস সমিতিচালিত বাসের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন বেশ কিছুদিন। তাঁর বাবা মজিবর রহমান ছিলেন বেবিট্যাক্সিচালক; মা মরিয়ম বেগম গৃহিণী। নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে; ঢাকার নারিন্দায়। তাঁরা ছিলেন ছয় ভাইবোন; নূর হোসেন তৃতীয়। ঢাকার গ্র্যাজুয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন তিনি। কিছুদিন কাজ করেন মোটর মেকানিক হিসেবে। কাজের ফাঁকে নিজ উদ্যোগে সদরঘাটের কলেজিয়েট নৈশ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।
নূর হোসেন স্বৈরাচারবিরোধী কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতেন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিল তিন জোটের (আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট, জাসদের নেতৃত্বে ৫ দলীয় জোট) ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি। ভোট ডাকাতির সংসদ বাতিল করে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে অবরোধ ডাকা হয়েছিল। এরশাদ সরকার অবরোধ কর্মসূচির আগের দিনই ঢাকার সঙ্গে সব যানবাহন যোগাযোগ বন্ধ করে কার্যত রাজধানীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। প্রতিবাদী নূর হোসেন পরিকল্পনা করেন কীভাবে অভিনব উপায়ে অবরোধে অংশ নেওয়া যায়। তিনি বুক-পিঠে আন্দোলনের স্লোগান লেখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর পরিচিত ইকরাম হোসেনের ব্যানার ও সাইনবোর্ড আঁকার দোকান ছিল মতিঝিল বিসিআইসি ভবনের পাশে। অবরোধের আগের দিন নূর হোসেন ইকরামের কাছে আসেন তাঁর বুক-পিঠে স্লোগান লিখে দেওয়ার অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে। প্রথমে ইকরাম অবাক হলেন; পরে পেলেন পুলিশের ভয়। কারণ তাঁর ঈপ্সিত স্লোগান ছিল- গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক। নূর হোসেনের জোরাজুরিতে ইকরাম বুক-পিঠে স্লোগান লিখতে বাধ্য হলেন। নূর হোসেন মিছিলে গেলেন। ইকরাম যে আশঙ্কা করেছিলেন তা-ই ঘটল। শুধু ইকরাম কেন? বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে যাঁরাই নূর হোসেনকে খালি গায়ে দেখেছেন, তাঁরাই তাঁকে দ্রুত জামা পরে বুক-পিঠে লেখা স্লোগান ঢেকে রাখতে বলেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ির কাছে যখন নূর হোসেন আশীর্বাদ নিতে আসেন; তিনিও তাঁকে জামা পরে নিতে বলেছিলেন। পুলিশ প্রতিবাদী যুবকের গায়ে লেখা শিল্পিত স্লোগানের জবাব দিল লেখাকে টার্গেট করে গুলির মাধ্যমে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে যখন তাঁর বন্ধুরা ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছিলেন, পুলিশ সে রিকশা থামিয়ে নূর হোসেনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা পুলিশ করেছে কিনা, জানা যায়নি। সম্ভবত অতিরিক্ত রক্তরক্ষরণে হূৎপিণ্ড বিদীর্ণ করা বুলেটে নূর হোসেনের মৃত্যু ঘটে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়, 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়'।
নূর হোসেনসহ অজানা সংখ্যক মানুষকে হত্যার প্রতিবাদে এবং এরশাদের পদত্যাগ দাবিতে ১১-১২ নভেম্বর পালিত হয় দেশব্যাপী হরতাল। এর পরেও লাগাতার হরতাল-অবরোধ চলতে থাকে। আন্দোলনে সেবারই ছাত্রদের ছাপিয়ে শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সংগঠিতভাবে অংশগ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালে শ্রমিক-পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ এত সংগঠিত ছিল; ১৯৯০ সালেও এত সংগঠিত অংশগ্রহণ ছিল না। তবে ১৯৯০ সালে নতুন মাত্রা যোগ করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের সংগঠিত আন্দোলন, যা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের হত্যাকাণ্ডে চূড়ান্ত গণবিস্ম্ফোরণে রূপ নেয়। আন্দোলনে আরেকটি মাত্রা যোগ হয় শেষ পর্যায়ে; ১৯৯০-এর ৩ ডিসেম্বর সচিবালয় থেকে কর্মকর্তাদের রাজপথে বেরিয়ে চিকিৎসক-ছাত্র-জনতার মিছিলে যোগদান। এ ঘটনা এরশাদের অবৈধ শাসনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। পরদিন ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের  ঘোষণা দেন।


নূর হোসেনের আত্মদানে আমরা সামরিক সরকারকে বিদায় করতে পেরেছি। কিন্তু স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কি বিদায় করতে পেরেছি? জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কি আমরা ঐকমত্য সৃষ্টি করতে পেরেছি? দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংবলিত সাংবিধানিক ব্যবস্থা হলো। কিন্তু সে সরকারকে কান টেনে নিজের দলের দিকে আনার কসরৎ দেখেছি আমরা। সরকার ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিত্বহীন, জবাবদিহিহীন মহলের অধিষ্ঠান দেখেছি। প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তী সংবিধানে সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই বাতিল হলো। আশা ছিল, অন্যান্য সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের দেশের মতো আমাদের দেশেও দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারা গড়ে উঠবে। তা কি হলো? একের পর এক অস্বাভাবিক নির্বাচন দেখতে হলো আমাদের। এর শেষ কোথায়? আমরা কোথায় যাব?
অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকারও নিশ্চিত করা গেল না। এখনও বিরোধী পক্ষের জমায়েত ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে হয় ১৪৪ ধারা জারি, নতুবা সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে অঘোষিত হরতাল-অবরোধ দেওয়া হয়। ভিন্নমতের মানুষদের ওপর অহরহ হামলা-মামলা চলছে। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৭৩ সালের প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্টের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল হয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। দুঃখজনকভাবে সংবাদমাধ্যম এখন অলিখিত ও অঘোষিত নানা নিষেধাজ্ঞার শিকার; বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়ে প্রাণ খুলে কথা বলা কিংবা কারও যৌক্তিক সমালোচনা করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। কথা ছিল, রাষ্ট্র ফিরে যাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ১৯৭২ সালের সংবিধানে; যেখানে ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কোনো জায়গা নেই। সে আশাও ফিকে হয়ে এসেছে। ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদের বাড়বাড়ন্ত এখন এতটাই যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে পারলে বাঁচে। '৭১-এর পরাজিত রাজাকার আর ৯০-এর পতিত স্বৈরাচার এখন ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর সহচরে পরিণত হয়েছে।
নূর হোসেন যে পরিস্থিতিতে জীবন দিয়েছেন, সে ধরনের পরিস্থিতিতে আর ফিরে যেতে চাই না আমরা। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়; শান্তিপূর্ণ পথে নির্বাচন পদ্ধতির ফয়সালা করে দেশের আর্থসামাজিক বিষয়কে প্রধান রাজনৈতিক আলোচ্যসূচি করতে চাই। যখনই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসবে তখনই নির্বাচন কীভাবে হবে- একই রাজনৈতিক বিষয় ঘুরেফিরে আমাদের উদ্বিগ্ন করবে; ঘুম কেড়ে নেবে; রক্তাক্ত করবে- এটি মেনে নেওয়া যায় না। নূর হোসেনকে যেন আমরা শান্তিতে ঘুমাতে দিই; দেশবাসীকেও শান্তি দিই।
ডা. মুশতাক হোসেন: স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাসদ; সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু

আরও পড়ুন

×