ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ

জলাভূমি বিপন্ন করে উন্নয়ন টেকসই হবে না

জলাভূমি বিপন্ন করে উন্নয়ন টেকসই হবে না
×

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২২:৫০

বলা যায়, নদী দিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি। নদীর পলির ওপর নির্ভর করে ফসলি জমির উর্বরতা। নদীভাঙন ও চর জেগে ওঠার ওপর জনজীবনের প্রভাব রয়েছে। নদীকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। নদী হচ্ছে জনসম্পদ, কিন্তু এটি কারও কারও কাছে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। দখল-দূষণের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে। ১৬ দশমিক ২ মিলিয়ন কৃষক ফসল আবাদে সেচ নেন নদী থেকে। সেচ নেওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনেও নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ৬০ শতাংশ প্রাণিজ আমিষ জোগান দেয় নদীর মাছ। বাণিজ্যিক মৎস্য চাষের চেয়ে প্রাকৃতিক মাছের গুরুত্ব বেশি। যাতায়াত ব্যবস্থায় নৌপথের মতো সহজ ও সস্তা মাধ্যম নেই। কিন্তু অব্যাহতভাবে জলাভূমি হারিয়ে যাওয়ায় নৌপথ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব জিডিপিতেও পড়ছে।

আমাদের দেশের বড় নদীগুলো বেহাল। প্রতিবেশী দেশ উজানে হওয়ায় ভাটির দেশ হিসেবে পানির ওপর স্বাভাবিক কারণেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বন্যায় প্লাবিত হতে হয়। আবার শুস্ক মৌসুমে পানির অভাবে ফসলি মাঠ ফেটে চৌচির হয়। আমরা এখনও জানি না আমাদের দেশে নদ-নদীর সংখ্যা কত; জলাভূমির সংখ্যা কত; একেক পরিসংখ্যানে একেক রকম তথ্য দেওয়া হচ্ছে। আমরা যদি জলাভূমির সঠিক সংখ্যা বা আয়তনই না জানি তাহলে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরিকল্পনা কীভাবে গ্রহণ করা হবে? সংরক্ষণ থেকে শুরু করে যে কোনো পরিকল্পনা নিতে গেলে সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন যে জলাভূমির সঠিক সংখ্যা জানতে পারলাম না, তা বোধগম্য নয়।

শিল্পকারখানার অব্যাহত দূষণের ফলে অনেক জলাভূমি হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা যদি ঢাকা শহরের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব- বুড়িগঙ্গা নদীতে ৩৯টি পাইপের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্য বুড়িগঙ্গা দূষিত করত। এখন সাভারের ট্যানারি পল্লির বর্জ্য ধলেশ্বরীতে যাচ্ছে। তাহলে লাভটা কোথায় হলো? বর্জ্য যদি নদীতেই ফেলতে হয় তাহলে ঢাকা শহর থেকে ট্যানারি শিল্প সরানোর সুফল কোথায় পেলাম? বালুকে এখন আর নদ না বলে বড়সড় ড্রেন বলাই উত্তম। পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার আশপাশের নদনদীর মধ্যে সবচেয়ে হুমকিতে রয়েছে তুরাগ। ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি নদী থাকতে আমাদের সাপ্লাইয়ের পানি আনতে হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা থেকে। এতে ওয়াসার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। অথচ ঢাকার আশপাশের নদীর পানি দিয়ে কম খরচে সাপ্লাইয়ের পানি সংগ্রহ করা যেত। আগেই বলেছি, শিল্পকারখানার কতিপয় মালিক ব্যক্তিস্বার্থে জলাভূমি ধ্বংস করছেন। আমার প্রশ্ন জাগে, তাঁদের ব্যবসার স্বার্থে আমরা সাধারণ মানুষ যে বিসর্জন দিচ্ছি, বিনিময়ে তাঁরা কি আমাদের লাভের ভাগ দেবেন?

জলাভূমি দূষণ ও দখলের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কম দায়ী নয়। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা দেশের অনেক স্থানে নদীকে বেছে নিয়েছে ময়লা ফেলার ভাগাড় হিসেবে। কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর দিকে তাকালে এর সত্যতা পাওয়া যায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি এ ধরনের উদাহরণ সৃষ্টি করে তাহলে অন্যরা উৎসাহিত হবে। তাই দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা যেন খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে না দাঁড়ায়, তা খেয়াল রাখা উচিত।


জাফলং, বিছনাকান্দিতে অপূর্ব সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা যেতেন। এখন গিয়ে এক বুক হতাশা নিয়ে ফিরে আসেন। অনবরত পাথর উত্তোলনের ফলে জাফলং ও বিছনাকান্দির সেই সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। এখনও যদি পাথর উত্তোলকারীদের লাগাম টেনে ধরা না যায় তাহলে আরও খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে। এ পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দখলদার পক্ষগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটে। আদালতের আদেশের পরও চক্রটিকে দমানো যাচ্ছে না। আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন। একদল পাথর ও বালুমহাল বানিয়ে সেই জীবন্ত প্রাণকে হরণ করছে। পাঁচ বছরে সিলেটে পাথর কোয়ারি থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৩৮ কোটি টাকার কিছু বেশি; অথচ এর ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য অপরিসীম।

৬০ হাজার নদী দখলদার রয়েছে। সম্প্রতি আরও ৩৭ হাজারের বেশি দখলদারের তালিকা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সেই তালিকা প্রকাশ না করে বলছে, এটি পানি আইন অনুযায়ী করা হয়েছে; সিএস খতিয়ান অনুযায়ী করতে হবে। আসলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা না থাকলে সাধারণ মানুষ কখনোই সুফল পাবে না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দপ্তরে সঠিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা ও স্বাধীনতা- এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

এরই মধ্যে ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। ৪৪৫টি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে আবার ৫০-৬০টি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। এখন থেকে উদ্যোগ না নিলে এসব জলাভূমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ১৯৭১ সাল থেকে দেশে নৌপথ কমছে। এই যে ঢাকা শহরে এত যানজট। আশপাশের নদীগুলো সচল করা গেলে নৌপথ চালু করে এই যানজটের যাতনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যেত। আমরা অবৈধ প্রকল্পের ছড়াছড়ি দেখছি। ড্যাপে প্রায় ৫০টি জলাভূমিকে হাউজিং দেখানো হয়েছে। ১৫৮ জলাভূমির মধ্যে ৫০টিকে হাউজিং দেখানো শুভ লক্ষণ হতে পারে না।

এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে উত্তরণে আমরা প্রাকৃতিক জলাভূমি সৃষ্টি করতে পারব না। কিন্তু শিল্পকারখানা নির্মাণ করতে পারব। তাই যেটা সৃষ্টি করতে পারব না, সেটা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। সংবিধানে জলাভূমি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা বলা আছে। জলাভূমির ওপর জেলে, কৃষক এবং যাতায়াত নির্ভরশীল। ভারত ও বাংলাদেশের জলাভূমির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমাদের দেশের হাওর ইকো পদ্ধতির। টাঙ্গুয়ার হাওরের আন্তর্জাতিক মান রয়েছে। সুন্দরবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পশুর নদের গুরুত্ব অনেক। এককথায় আমাদের জলাভূমির অনুপম বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

পরিবেশ দূষণের কারণে জিডিপির ৩-৫ শতাংশ ধ্বংস হচ্ছে। পরিবেশকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন টেকসই হবে না। প্রতি জেলায় জলাভূমি সংরক্ষণে আন্দোলন হচ্ছে। এটি মানুষের জীবনকে সম্পৃক্ত করে রাখে বলেই তাঁরা নিজ উদ্যোগে সোচ্চার হচ্ছেন। দখল নিয়ে যতটা কথা হয়, দূষণ নিয়ে এর সিকি ভাগও হয় না। দূষণের জন্য দায়ী শিল্পকারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। মাঝে মধ্যে নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পলিথিন উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে ২-৭ ফুট স্তরের পলিথিনের বর্জ্য উদ্ধার করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এটির বাস্তবায়ন দরকার। একবার ব্যবহার উপযোগী পলিথিনের বিকল্প ভাবতে হবে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)

আরও পড়ুন

×