ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধর্তব্য ধামাচাপা

ধর্তব্য ধামাচাপা
×

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৩ | ২০:০৬

কুমিল্লার দেবিদ্বারে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ কথিত সালিশের মাধ্যমে বিচারের যে অভিযোগ রবিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, তথাকার পৌর এলাকার এক কর্মজীবী নারী প্রতিবেশীর বাড়ি হইতে প্রত্যাবর্তনকালে তাঁহারই তিন সহকর্মী তুলিয়া লইয়া ধর্ষণ করে। আরও জঘন্য, ভুক্তভোগীর পরিবার প্রতিকারের আশায় আইনের আশ্রয় লইতে চাহিলে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি; যাঁহাদের মধ্যে অভিযুক্ত একজনের নিকটাত্মীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাও রহিয়াছেন– তাঁহাদের বাধা দেন এবং কথিত সালিশের মাধ্যমে অভিযুক্তদের দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য করেন।

অন্যদিকে এই সকল প্রহসনের পাশাপাশি ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির কোনো সম্ভাবনা না দেখিয়া ভুক্তভোগী নারী ক্ষোভ-অপমানে আত্মহত্যা করেন। এই চিত্র সভ্য সমাজের জন্য কলঙ্ক বৈ কিছু নহে। আমরা মনে করি, উক্ত নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মাধ্যমে অভিযুক্তরা যে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করিয়াছে, উহাকে ধামাচাপা দিবার প্রয়াস তাহার চাইতে কম মাত্রার অপরাধ নহে। উপরন্তু ভুক্তভোগীর আত্মহত্যার দায়ও ধর্ষক এবং উক্ত সালিশকারীরা এড়াইতে পারেন না। এই ধামাচাপা যে কোনো বিবেচনাতেই গুরুতররূপে ধর্তব্য।

স্মরণ রাখিতে হইবে, ধর্ষণ এক অমার্জনীয় অপরাধ এবং প্রচলিত কোনো আইন এই প্রকার অপরাধ সালিশ বা আদালতের বাহিরে নিষ্পত্তির অনুমোদন দেয় না। অধিকন্তু উক্ত সালিশের ঘটনা উচ্চ আদালতের রায়েরও পরিষ্কার লঙ্ঘন। ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত উক্ত রায়ে আদালত ধর্ষণের ক্ষেত্রে যে কোনো প্রকার সালিশ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য ঘটনায় যথাযথ তদন্তপূর্বক সকল অপরাধীকে অবিলম্বে বিচারের মুখোমুখি করিতে পুলিশ ও প্রশাসন তৎপর হইবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবার যাহাতে প্রভাবশালীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করিয়া আইনি লড়াই চালাইয়া যাইতে পারে, সেই দিকেও দৃষ্টি দিতে হইবে। পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও দাঁড়াইতে হইবে পরিবারটির পাশে।

ধর্ষণ বা অনুরূপ অপরাধ ভুক্তভোগী নারীকে যে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন করে, উহার ধকল সহ্য করিবার ক্ষমতা বিশেষত আমাদের মতো পশ্চাৎপদ সমাজে সকলের থাকে না। তাই দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে অধিক। আমাদের সমাজে এখনও যে কোনো প্রকার যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিকেই সামাজিকভাবে বিবিধ হেনস্তার শিকার হইতে হয়। অনেককেই সমগ্র জীবন উহার জের টানিতে হয়। এহেন সামাজিক সংকট পরিহারে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় ধর্ষণ কিংবা যে কোনো প্রকার যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর পরিবার ঘটনা আড়াল করিতে শশব্যস্ত। ফলস্বরূপ দেশে প্রতি বৎসর এই প্রকার অপরাধ যতসংখ্যক ঘটে; থানায় মামলার সংখ্যা তৎঅপেক্ষা অনেক কম। ইহার মধ্যে যদি দেবিদ্বারের অনুরূপ অন্যত্র প্রভাবশালী সালিশকারীরা অবাধে তাহাদের তৎপরতা চালাইবার সুযোগ পায়, তাহা হইলে পরিস্থিতি যথায় গিয়া পৌঁছাইবে, উহা অন্তত আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক নহে।

এ জন্যই আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে ধর্ষণ বা তদনুরূপ অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি এহেন অপরাধের শিকার নারীদের জন্য ত্বরিত আইনি প্রতিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

আমরা জানি, সচেতন নাগরিকদের উত্তরোত্তর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার  ইতোমধ্যে ধর্ষণের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড ধার্য করিয়াছে। প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহেও প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনিয়াছে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় গ্রহণে অনুকূল পথ না পাইলে বা আগ্রহী না হইলে এই সকল কার্যকর বিধান কার্যকর ফল দিবে না। তাই জনগণকে এই বিষয়ে সচেতন করিবার লক্ষ্যে জোরদার প্রচার কার্যক্রম চালানোও জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। এই ক্ষেত্রে সচেতন মহল বিশেষত নারী অধিকারবিষয়ক সংস্থাসমূহেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। শুধু ঘটনা ঘটিবার পর নহে; সমগ্র বৎসরই বিষয়সমূহ লইয়া তাহাদের উচ্চকণ্ঠ থাকা জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি।

আরও পড়ুন

×