নারী ফুটবল দল
খেলতে যেতে না পারার কারণ শুধু অর্থ নয়
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০
‘অর্থের অভাব’ দেখিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন-বাফুফে তাড়াহুড়া করে ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে বাছাই পর্ব খেলতে মিয়ানমারে নারী জাতীয় দল পাঠানো থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ নারী জাতীয় দল ছয় মাস আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান ফুটবলে শিরোপা জিতেছে। অলিম্পিক বাছাই পর্বে বাংলাদেশ গ্রুপে ছিল ইরান, মিয়ানমার ও মালদ্বীপ। আমি মনে করি, এখানেও বাংলাদেশ জয় পেত।
সাফ শিরোপা জয়ের পর বাফুফে সভাপতি বলেছিলেন, এখন থেকে নারী দলের চোখ হবে এশিয়ান দেশ। নারী দল যাতে সব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, সেই অর্থের জোগাড় আমরা করব। বাস্তবে এর প্রমাণ দিতে পারলেন না।
গত কয়েক বছর ধরে নারী ফুটবল দলের সাফল্য বিশেষ করে বয়সভিত্তিক খেলায় সাফল্য ছিল বাফুফের অন্ধের যষ্টি। গুমোট আবহাওয়ার মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি। অথচ ফুটবল ফেডারেশন নিজেই হটকারিতার মাধ্যমে নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করল। বিষয়টি এখন বুমেরাং হয়ে ফুটবল ফেডারেশনকে শুধু বিতর্কিত করেনি; নিন্দার বোঝাও ঘাড়ে চেপেছে। জনগণের মনোভাব উপেক্ষা করে, নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে বাফুফে আবারও প্রমাণ করেছে, ফুটবলে স্ববিরোধিতা ক্রমেই বাড়ছে। বাড়ছে নারী-পুরুষে বৈষম্য। আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মনোভাব এই চত্বর থেকে বিদায় নিতে বসেছে।
দেখা যাচ্ছে, ফুটবলের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে পাঁচ বছরের জন্য ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছিল। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানোর পর আর ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বাফুফে হয়তো ভেবেছিল, যেহেতু সোজা আঙুলে ঘি উঠছে না, অতএব এমন কিছু করতে হবে, যাতে টনক নড়ে ফুটবল অনুরাগী ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এমনকি ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ সরকারপ্রধানের অফিস পর্যন্ত। মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাস্তবে হিতে বিপরীত হয়েছে।
এই প্রশ্নও মনে জাগে, মিয়ানমারে অলিম্পিক ফুটবলে অংশগ্রহণের জন্য ঠিক কত লাখ টাকার প্রয়োজন ছিল? বিষয়টি নিয়েও মতপার্থক্য আছে। ৮০ থেকে ৯০, ৭০ থেকে ৮০, ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা– এই ধরনের অঙ্কের কথা ফেডারেশনের কর্মকর্তারাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন। হোমওয়ার্কে ঘাটতি থাকায় ঠিক কত লাখ টাকা হলে নারী জাতীয় দল অংশ নিতে পারত– এই অঙ্কটিও ঠিকঠাক বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা!
ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট মিডিয়াকে জানিয়েছেন, তাঁরা সেই গত বছর থেকে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী নারী ফুটবল দলের জন্য ঘোষিত পুরস্কারের ৫১ লাখ টাকার চেক তৈরি করে হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিলেন। ফেডারেশন থেকেই বলা হয়েছিল, ‘সময়মতো’ এই টাকা নেওয়া হবে। এই মাসে এসে সেই টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ আগে নিলে এই টাকা দিয়ে তো অনায়াসে নারী দল যেতে পারত অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে। পরে সমন্বয় করলেই হতো।
নারী ফুটবল দল অর্থের অভাবে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে যেতে পারেনি। অথচ দেশে কোটি টাকার বেশি খরচ করে অপেশাদার খেলোয়াড় সমন্বয়ে গঠিত সিশেলসের সঙ্গে দুটি ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচের আয়োজন করে বাংলাদেশের সঞ্চয় শুধু একরাশ হতাশা। এই দুটি ম্যাচ খেলার জন্য পুরুষ জাতীয় দলকে সৌদি আরবে পাঠিয়ে নিবিড় অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সিলেট স্টেডিয়ামে খেলায় এক ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে, আরেক ম্যাচে হেরেছে। র্যাঙ্কিয়ে বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং অতিথি দল সিশেলসের লাভ হয়েছে। সর্বশেষ র্যাঙ্কিয়ে তারা দুই পয়েন্ট এগিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি ক্রীড়াঙ্গনকে তাঁর চিন্তাজগৎ থেকে সরিয়ে রাখেন না– এ বিষয়টি দল ও মতে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সবাই স্বীকার করেন। তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতি বোঝেন এবং সব খবর রাখেন। নারী দলকে অর্থের অভাবে প্রাক-অলিম্পিক বাছাইয়ে পাঠানো হচ্ছে না, এটি জানার পর বাফুফের সভাপতিকে প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে যেতে বলেছেন। বাফুফে সভাপতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন তাঁর ভুলের জন্য। সরকারপ্রধানকে জানিয়েছেন, এখন আর কিছু করার নেই; আগেই অংশগ্রহণ না করার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অথচ প্রাক-অলিম্পিকে খেলার সুযোগ ঘটতে যাচ্ছে, এটা তো ছয় মাস আগে থেকেই জানা। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবে অর্থ চেয়ে (চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে।) এক দিন পরই সংবাদ সম্মেলনে নারী দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তো আর অর্থ নিয়ে বসে নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তো অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার কিছু নিয়ম ও সময় লাগে। সেই সময় না দিয়ে উল্টো মন্ত্রণালয় এবং অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে দোষারোপ করা হয়েছে। ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির সরাসরি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললে পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো।
এখন বাফুফে সম্ভবত বুঝতে পারছে, অলিম্পিক বাছাই থেকে নাম প্রত্যাহার করে ভীষণ কাঁচা কাজ করা হয়েছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দুঃখ প্রকাশ করে এখন চেষ্টা চলছে পুরো বিষয়টা ঘিরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানোর। আগামীতে নারী দলের যে কোনো কর্মসূচির ক্ষেত্রে আগাম উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের রাগ ভাঙানোর চেষ্টা হচ্ছে। কথা হচ্ছে, বিলম্বে বুঝে ওঠায় তো কোনো লাভ নেই। এটি ফেডারেশনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। আর এর দায় তাদের নিতেই হবে।
শুধু নারী দল নয়, সামগ্রিক ফুটবলে সমস্যার জন্ম সেই নব্বইয়ের পর থেকে। বছরের পর বছর ধরে যে খেলা চলছে, তাতে সংগঠকরা কে কতটুকু জিতেছেন, কার কতটুকু স্বার্থ হাসিল হয়েছে, কে কীভাবে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন– এ সবকিছু এক পাশে সরিয়ে এনে বলা যায়, মাঠের ফুটবল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খেলাটি শুধু নিচের দিকেই নেমেছে। বাফুফের অব্যবস্থাপনা দূর করে ফুটবলকে জাগিয়ে তোলার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
ইকরামউজ্জমান: ক্রীড়া লেখক ও বিশ্লেষক; সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া
- বিষয় :
- নারী ফুটবল দল
- ইকরামউজ্জমান
