মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৩ | ২০:৪৮
ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি লইয়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যাহা চলিতেছে, উহাকে এক প্রকার অরাজকতা বলিলে ভুল হইবে না। গত বৎসর জুলাই মাসে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ব্যতিরেকে নিছক কোম্পানিগুলির সুপারিশের ভিত্তিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ৫৩টি ঔষধের মূল্য বৃদ্ধি করে। এক বৎসরেরও কম সময়ের মধ্যে সম্প্রতি সকল প্রকার ঔষধের মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি করা হইয়াছে।
অধিকতর উদ্বেগজনক বিষয়, যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দাবি করিয়াছেন–তাঁহারা ঔষধের মূল্য ১০ হইতে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করিয়াছেন, বাস্তবে শুক্রবার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে উক্ত নির্দেশনা উপেক্ষিত হইয়াছে। যে কারণে ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-পিএমও হইতে সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে পত্র প্রেরণ করা হইয়াছে। উল্লেখ্য, দেশে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় ২১৯টি ঔষধ রহিয়াছে। এইগুলির মধ্যে ১১৭টি ঔষধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করিয়া দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অন্যান্য ঔষধের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলির সুপারিশ বিবেচনা করিয়া মূল্য নির্ধারণ করিয়া দেয় অধিদপ্তর।
তবে নিয়ম হইল, অধিদপ্তরকে মাঠ পর্যায়ে ঔষধের অতিরিক্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণে তদারকি করিতে হয়; যাহা নাই বলিয়াই দেশীয় কোম্পানিগুলি উৎপাদিত ঔষধের মূল্য বাড়াইবার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত; পরিণামে বিদ্যমান অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে।
ঔষধের এই উপর্যুপরি মূল্যবৃদ্ধি এমন সময়ে ঘটিয়াছে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, তৎসহিত আমাদের দেশেও মূল্যস্ফীতি প্রকট রূপ ধারণ করিয়াছে। বস্তুত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ চরম সংকটে পতিত। বিভিন্ন কারণে প্রকৃত আয় হ্রাস পাইবার কারণে এ সকল জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন ব্যয়ের টাকা আহরণে হিমশিম খাইতেছেন। ফলে ঔষধের এই বে-লাগাম মূল্যবৃদ্ধি তাহাদের জীবনে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’স্বরূপ দেখা দিয়াছে। অনস্বীকার্য, বিদ্যমান বিশ্বপরিস্থিতিতে অন্যান্য পণ্যের ন্যায় সকল প্রকার ঔষধের কাঁচামালেরও মূল্য বৃদ্ধি হইয়াছে। উপরন্তু ডলার সংকটের কারণে ঔষধের কাঁচামালের আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাইয়াছে। কিন্তু এই সকল কিছু ঔষধ কোম্পানিগুলির খেয়ালখুশি অনুসারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধিকে যৌক্তিকতা দেয় না।
আমরা মনে করি, এইখানেই সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জোরদার তদারকির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠে। যাহা হউক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য জনবল সংকটকে দায়ী করিলেও সমস্যাটির শিকড় প্রকৃতপক্ষে আরও গভীরে। তাহা হইল, অন্য প্রায় সকল সরকারি সংস্থার মতন জনস্বার্থের প্রতি তাহাদের উদাসীনতা। যে কারণে দুঃখজনকভাবে, পিএমওর নির্দেশনা সত্ত্বেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নিছক কিছু কথার কথা বলিয়াই দায়িত্ব সমাপ্ত করিতে সচেষ্ট।
অভিযোগ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রকৃতপক্ষে ঔষধ কোম্পানিসমূহের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর। এই অভিযোগের কারণ, ইতোপূর্বে একাধিকবার একটি যুগোপযোগী ঔষধ নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে অধিকাংশ ঔষধের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হস্তে প্রদানের উদ্যোগ গৃহীত হইলেও মূলত অধিদপ্তরের আন্তরিকতার ঘাটতির কারণে উহা আলোর মুখ দেখে নাই। এমনটাও মনে করা হয়, ১৯৮২ সালের জাতীয় ঔষধ নীতি কঠোরভাবে অনুসৃত হইলে রোগী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উভয়ের স্বার্থই রক্ষা হইত। কিন্তু এই ব্যাপারেও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হইতেছে না।
অস্বীকার করা যাইবে না, দেশে অন্য সকল খাতের ন্যায়– সেবাধর্মী হইলেও চিকিৎসা খাতও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণের শিকার। ইহাতে লাগাম পরাইতে না পারিলে পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা বৃথা।
আমাদের প্রত্যাশা, দেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ রোগীর স্বার্থে সরকার এই লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিবে। তবে আশু করণীয় হইল ঔষধের মূল্য নির্ধারণ শুধু নহে; বাজার তদারকিতেও ঔষধ প্রশাসনকে তৎপর করিয়া তোলা।
