ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গ ণ ত ন্ত্র

নির্বাচনী ব্যবস্থার আসল সংকট যেখানে

নির্বাচনী ব্যবস্থার আসল সংকট যেখানে
×

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৩ | ০৪:০৭

আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রক্রিয়া হচ্ছে নির্বাচন। এই নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত বাংলাদেশের মতো অবিশ্বাস ও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার দেশে।

 নির্বাচন হচ্ছে ব্যক্তি ও দলের প্রতি জনসমর্থন নির্ধারণের মানদণ্ড। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি ও দল শাসন ক্ষমতার অধিকার অর্জন করে। শাসন ক্ষমতা অর্জন করতে হলে ব্যক্তি বা দলকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ মানুষের সমর্থন আদায় করতে হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রধানত দু’ভাবে নির্ধারিত হয়। একটি হচ্ছে ‘এফপিটিপি’ (সংখ্যাগরিষ্ঠ), অন্যটি ‘প্রপোরশনাল’ (সংখ্যানুপাতিক)। প্রশ্ন হচ্ছে, এ দুই পদ্ধতির কোনটি অধিক গণতান্ত্রিক ও যুক্তিসংগত? এ দুইয়ের মধ্যে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিই অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রকৃত সংখ্যাধিক্যের প্রতিনিধিত্ব করে, যা এফপিটিপি করে না। তা না করলে কেন গণতন্ত্রের নামে সেই পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে? যা প্রকৃত গণতন্ত্রকে বিতর্কিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এখন যেটি হয়, কোনো একটি আসনে অনেক প্রার্থীর মধ্যে যিনি বেশি ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন। মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের হিসাবে তিনি প্রদত্ত ভোটের ৫১ শতাংশ না পেলেও তিনিই হন সেই এলাকার জনপ্রতিনিধি। এ ব্যবস্থায় জাতীয় নির্বাচনে একটি দল ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রতিটিতে ২০ শতাংশ ভোট পেয়েও একটি আসনও না পেতে পারে। অন্যদিকে একটি দল ২৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রয়োজনীয় আসন পেয়ে ক্ষমতায় যেতে পারে। কিন্তু ভোটের ব্যবধান মাত্র ৭ শতাংশ। এখানে দুই দল মিলেও ৫১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পায় না। এটিই এই পদ্ধতির সবচেয়ে দুর্বলতা। ২০০৮-এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা জাতির কোনোভাবেই প্রাপ্য ছিল না। সেটি ছিল ক্ষমতাসীনদের তৈরি করা সংকট। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেই এ সমস্যার সমাধান হবে– এমনটা নয়। সংকট আরও গভীরে। এর তাৎক্ষণিক ও খণ্ডিত সমাধান দীর্ঘ মেয়াদে কোনো সমাধান দেবে না।

চলমান নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে নির্বাচন কমিশনে রদবদল, আইনি সংস্কার এমনকি নির্বাচন সহায়ক সরকার নয়; প্রয়োজন নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। দরকার সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী (Proportional Representative) ব্যবস্থার। কেন এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, এখানে তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার পর্যালোচনা

তত্ত্বগতভাবে আমরা জানি, নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে নাগরিকরা ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। বর্তমান ব্যবস্থায় আসনভিত্তিক ‘অনেক প্রার্থীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন তিনিই জয়ী’ (First Past The Post-FPTP)। প্রচলিত FPTP ব্যবস্থায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের সঙ্গে মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ আসন পেয়েছে মাত্র ৬২টি। অর্থাৎ মাত্র ২১ শতাংশ আসন। বিএনপি-জামায়াত জোট ৪৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ২০৮টি। অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ আসন। এখানে বিএনপি মাত্র ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসনের চেয়ে ১৪৬টি বেশি। অর্থাৎ ২৩৫ শতাংশ বেশি আসন। এই হিসাবই বলে দেয়– FPTP ব্যবস্থায় জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না। আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ তখনই বলা যাবে, যখন ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৫১ জন কারও পক্ষে থাকবে বা সমর্থন করবে। অঙ্ক-বিজ্ঞান তাই বলে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন এই অদ্ভুত সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংজ্ঞা বিদ্যমান এবং তা যুগ যুগ ধরে অব্যাহত? এই ব্যবস্থা গণতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে জনগণকে বঞ্চিত ও প্রতারণা করা। তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যে যদি সংযোগ ঘটানো না যায়, তাহলে পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক, তার একটি পর্যালোচনা লক্ষ্য করুন।


৪টি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ

পঞ্চম থেকে নবম জাতীয় এই ৪টি নির্বাচনের ফলাফলকে বেছে নেওয়া হয়েছে কারণ, এই নির্বাচনগুলো কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি (ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন–১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ ব্যতীত), তা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। যাকে আমাদের নির্বাচনের মানদণ্ডে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট; আসন পেয়েছিল ১৪০টি এবং আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট; আসন পেয়েছিল ৮৮টি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট; আসন ছিল ১৪৬টি এবং বিএনপি পেয়েছিল ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট; আসন সংখ্যা ছিল ১১৬টি।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ৪০ দশমিক ৪১ শতাংশ ভোট এবং আসন সংখ্যা ছিল ১৯৩টি। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ভোট এবং আসন সংখ্যা ছিল ৬২টি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪৯ শতাংশ ভোট; আসন সংখ্যা ছিল ২৩০টি। বিএনপি পেয়েছিল ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোট; আসন সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০টি।

ওপরের ফলাফল থেকে ৪টি জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের হার ও প্রাপ্ত আসনের তুলনামূলক চিত্র পেলাম। এবার হিসাবটা একটু অন্যভাবে করা যাক। দেশে যদি সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এই চিত্রটা কেমন হতো? প্রদত্ত ভোটকে ১০০ শতাংশ ধরে হিসাবটা করছি। ১৯৯১ সালের ভোটের হিসাবে বিএনপি আসন পেত ৯৩টি এবং আওয়ামী লীগ আসন পেত ৯০টি। ১৯৯৬ সালের ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ আসন পেত ১১৩টি, বিএনপি পেত ১০১টি। ২০০১ সালের ভোটের হিসাবে বিএনপি আসন পেত ১২৪টি, আওয়ামী লীগ আসন পেত ১২০টি। ২০০৮ সালের ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ আসন পেত ১৪৭টি এবং বিএনপি পেত ৯৯টি। এফপিটিপি ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোট ও আসন বণ্টনের যে গরমিল; এটিই বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটি। এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে না। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা থাকলে আসন সংখ্যার ভারসাম্যহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষমতাসীনরা সংবিধান পরিবর্তন করে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত করতে পারত না। যে কারণে এই নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার ও পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু সে কথা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বলছে না।

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন কী?

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি নির্বাচন বলতে এমন এক ধারণাকে বোঝায়, যেখানে কোনো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে, সেখানে তারা কত শতাংশ ভোট পেল, তার ভিত্তিতে সংসদে তাদের আসন নির্ধারিত হবে। কোনো নির্বাচনে কোনো দল প্রদত্ত ভোটের ৩০ শতাংশ পেলে তাহলে ধরে নিতে হবে, সেই দল সংসদের ৩০ শতাংশ আসন পাবে। এ ব্যবস্থায় পার্টির কর্মসূচি অধিক গুরুত্ব পায় এবং পার্টিই নির্বাচনের প্রাণ হিসেবে কাজ করে।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি নির্বাচন ব্যবস্থা দুই ভাবে হতে পারে– এক দলভিত্তিক, অন্যটি ব্যক্তিভিত্তিক। দলভিত্তিক নির্বাচনে সেখানে কোনো দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করবেন না। নির্বাচন করবে দল ও তাদের কর্মসূচি। যেমন নেদারল্যান্ডসে দলভিত্তিক এবং স্পেনে ব্যক্তিভিত্তিক সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি নির্বাচনী ব্যবস্থা বিদ্যমান। বিশ্বের ৫০টির অধিক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এ ব্যবস্থা প্রচলিত। আবার অনেক দেশে দুই ব্যবস্থার (PR-FPTP) সংমিশ্রণও আছে। বাংলাদেশ কোনো নীতিমালার ভিত্তিতে দুই পদ্ধতিই অনুসরণ করতে পারে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কা, নেপালে এই ব্যবস্থা চালু আছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা যতটা না জনস্বার্থকেন্দ্রিক, তার অধিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যে কারণে বলছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুর চেয়ে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবি উত্থাপন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। দেশে ৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। তাতে দেশের রাজনৈতিক সংকট কমেনি; তা ক্ষমতা বদলের আপাত প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করেছে মাত্র।

স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থাই বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের প্রধান উপায় হতে পারে। এই ধারা-ব্যবস্থা কার্যকরা করা গেলে অনৈক্য ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি অনেকাংশে কমবে।   

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×