তৃতীয় মেরু
রেলপথ বোঝ, ঢলপথ বোঝ না!
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৩ | ১২:১৮
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচটি জেলার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলো; ফেসবুকে কয়েকজনের ‘ফার্স্টহ্যান্ড’ পোস্ট দেখলাম। মনে হলো, বন্যার চেয়ে বিস্ময়ের ধাক্কাই তাদের বেশি কাবু করে ফেলেছে। ওই অঞ্চল মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক জোয়ার, নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় দেখে থাকলেও কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই প্রথম বন্যা দেখছে। সংবাদমাধ্যমে খানিকটা কম এসেছে; কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন নির্মিত যে রেলপথ উদ্বোধনের অপেক্ষায় পাহাড় ও সাগরের মাঝে ভেদরেখা হয়ে শুয়ে আছে; এবারের বন্যার দায় সেটারই। বিষয়টি এখনও অপ্রমাণিত; অনুমান বা অভিযোগ মাত্র। প্রকল্পটির পরিচালক মো. মফিজুর রহমানও বলেছেন, ‘রেলপথের কারণে পানি আটকে বন্যা হওয়ার কারণ নেই’ (সমকাল, ১০ আগস্ট ২০২৩)। কিন্তু রেলপথটি নির্মিত হওয়ার আগে কখনও ওই অঞ্চলে এমন বন্যা যে হয়নি, সেটা তো সত্য!
সাধারণত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক বা মৌসুমি বন্যা দেখে দেখে অভ্যস্ত আমরা। চট্টগ্রাম অঞ্চল আর যাই হোক, ‘বন্যাপ্রবণ’ নয়। ভ্রান্ত উন্নয়ন দর্শন ও প্রকৃতিবিরোধী তৎপরতায় গত দেড় দশক ধরে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে বটে, সেটা যে এভাবে পাঁচটি জেলায় ছড়িয়ে পড়বে ও সপ্তাহব্যাপী আটকে থাকবে– এমন আগে কখনও দেখা যায়নি। এবার তাহলে এমন প্রবল বন্যা হলো কেন?
এটা ঠিক, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ঘটেছে। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে রেকর্ড তাপদাহ এবং প্রায় বৃষ্টিহীন আষাঢ় ও শ্রাবণের হিসাব প্রকৃতি যেন কড়া-গণ্ডায় পুষিয়ে দিচ্ছিল। যেখানে ৩০-৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই নাগরিক সড়কে পানি জমে যায়, সেখানে চট্টগ্রাম বা বান্দরবানে কোনো কোনোদিন ২৪ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ক্লাউড বার্স্ট’ বা মেঘ-বিস্ফোরণ ঘটতে থাকবে। বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে স্বাভাবিক বৃষ্টি ঝরানোর বদলে সীমিত অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হবে। গত বছর মেঘালয়-সিলেট অঞ্চলে শতবর্ষের রেকর্ড ভেঙেছিল; এবার চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ঘটল। কিন্তু মেঘ-বিস্ফোরণও যদি হয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে জলাবদ্ধতার কারণ অন্তত ভূগোলে নেই; আছে অব্যবস্থাপনায়।
নগরবিদরা বলে থাকেন, যদি কোনো জনপদের পাশে নদী থাকে, ভেতরে ও বাইরে খাল থাকে; তাহলে বন্যা হলেও সেটি দ্রুত নিষ্কাশিত হয়ে যায়। উপকূলীয় জনপদের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক জোয়ারে পানি উঠে এলেও ভাটার টানে ফিরেও যায়। রীতিমতো নুহের প্লাবন না হলে পাহাড়ি জনপদে বর্ষণের পানি তো গিরিখাতেই মিলিয়ে যাওয়ার কথা।
এটা ঠিক, পাহাড়ি নদীগুলো বর্ষকালে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থসূত্রে আমরা জানি, পুলিশ কর্মকর্তা বাবার চাকরিসূত্রে তিনি বান্দরবানে ছিলেন। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্তশিষ্ট শঙ্খ নদীর তীরে বেড়াতে গিয়ে পরিচয় ‘নিশিদাদা’র সঙ্গে। তিনি পড়াশোনায় যেমন তেমন, শরীরচর্চায় দিগগজ। একবার হুমায়ূনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন মাছ ধরতে। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘নিশিদাদার সঙ্গে ছাতা মাথায় আমি রওনা হলাম। নদীর তীরে এসে মুখ শুকিয়ে গেল। বর্ষার পানিতে শঙ্খ নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তীব্র স্রোত। বড় বড় গাছের গুঁড়ি ভেসে আসছে। এই শঙ্খ নদী আগের ছোট্ট পাহাড়ি নদী না, এই নদী মূর্তিমতি রাক্ষসী।’ নিশিনাথ খেপজাল ফেললেন, আর কিশোর হুমায়ূনের মনে হলো যেন শঙ্খ নদী তাঁকে হাত বাড়িয়ে টেনে নিয়ে গেল। ভেসে উঠলেন না। হুমায়ূন চিৎকার করতে করতে, ছুটতে ছুটতে বাসায় ফেরেন। নিশিনাথের লাশ পাওয়া গেল সন্ধ্যায়, সাত মাইল ভাটিতে।
কেবল শঙ্খ নয়; মুহুরী, ফেনী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, মেইনি, চেঙ্গি, ডলু, বাঁকখালী, নাফ– বৃহত্তর চট্টগ্রামের সব নদনদীই শীত-গ্রীষ্মে তিরতির করে বয়ে চলে এবং বর্ষায় ভয়ংকর হয়ে ওঠে। নদী তো বটেই; ছোট খাল ও পাহাড়ি ছড়াগুলোও বর্ষাকালে আক্ষরিক অর্থেই বৈদ্যুতিক বেগে বয়ে চলে। সামনে যা পায়, ভেঙে ও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যেমন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে শ্রীমাই নামে ছোট্ট একটি খাল রয়েছে। এর ওপরে নির্মিত ভারী লোহার রেল সেতুটিরও একটি অংশ পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। আলোকচিত্র দেখে বোঝা যায়, কয়েক টন ওজনের লৌহখণ্ডটিও স্রোতের কাছে কতটা তুচ্ছ ছিল। (বাংলা ট্রিবিউন, ১০ আগস্ট ২০২৩)। তার মানে, প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নকালে এ ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়নি?
অথচ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর একটি। বরাদ্দও বিপুল– ১৮ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে এডিবি। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যেমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল, তেমনই পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও সম্পন্ন করা হয়েছিল। যে কারণে হাতি ও বন্যপ্রাণী চলাচলের জন্য ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের মতো বিষয়ও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি? অবিশ্বাস্যই মনে হয়– ২০২০ সালে এডিবিকে দেওয়া স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকের পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্য গুরুত্ব পেলেও পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নেই! (সমকাল, ১০ আগস্ট ২০২৩)।
বন্যায় ভুক্তভোগীরা অবশ্য এসব সমীক্ষা বা প্রতিবেদনের ফাঁকফোকরের ধার ধারেন না। তারা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পারছেন, কোথাও না কোথাও গলদ আছে। যেমন চকরিয়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেছেন, ‘বহু বন্যা, সাইক্লোন দেখেছি। কখনোই ঘরের চালের ওপর এভাবে পানি উঠতে দেখিনি। রেলপথের কারণে এবার পানি নামতে পারছে না।’ তাঁর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও মিলে যায়। যেমন বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক বলেছেন, ‘নিষ্কাশনের পথে রেলের স্থাপনা তৈরি হয়েছে। রেলপথও স্থলভাগ দিয়ে গেছে আড়াআড়িভাবে। এতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।’ (সমকাল ১০ আগস্ট ২০২৩)। এমনকি রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ এক কর্মকর্তাও বলছেন, ‘প্রায় ১০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মিত হওয়ায় প্লাবনের পানি নামার সময় বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে অমূলক নয়।’ (বণিক বার্তা, ১০ আগস্ট ২০২৩)। আর কী প্রমাণ লাগবে– চট্টগ্রাম অঞ্চলের এবারের বন্যা ‘মনুষ্যসৃষ্ট’ নয়?
এটা ঠিক, এডিবি প্রকাশিত প্রকল্পের নথি অনুযায়ী ১০৩ দশমিক ৪৭৭ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেলপথটিতে চারটি নদী– কর্ণফুলী, শঙ্খ, মাতামুহুরী, বাঁকখালীতে চারটি বড় সেতু, ৩৫টি মাঝারি সেতু ও ১৪৫টি কালভার্ট রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকও বলছেন, ওই অঞ্চলে ১০০ বছরের বন্যার ইতিহাসের ভিত্তিতে সেতু ও কালভার্টের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে নকশা করা হয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
একটি নিরীহ প্রশ্ন হচ্ছে, এসব নকশা করার সময় বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পার্থক্য কি বিবেচনায় রাখা হয়েছিল? বন্যা যেভাবে ধীরে ধীরে আসে ও উচ্চতা বাড়ে; পাহাড়ি ঢলের ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না। মেঘনায় যেভাবে বন্যায় পানির উচ্চতা সময় নিয়ে বৃদ্ধি পাবে, পাশেই কর্ণফুলীতে সেভাবে ঢলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে না। চট্টগ্রাম অঞ্চলের চারটি বৃহৎ নদী এবং সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য খাল-ছড়া শত শত বছর ধরে প্লাবনভূমি হয়ে সরাসরি সাগরে মিশেছে। সেই প্লাবনভূমিতে আড়াআড়ি শত কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের সময় বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির তীব্র বেগ কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল?
কবি হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন, ‘নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না!’ প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা রেলপথ নিশ্চয়ই বোঝেন; প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় পাহাড়ি ঢলপথ কতখানি; বুঝতে চেয়েছিলেন? হেলাল হাফিজের কবিতার শিরোনাম ‘অশ্লীল সভ্যতা’। দৃশ্যত ও কার্যত বন্যা অনিবার্য করে তোলা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পটির শিরোনাম কী দেওয়া যায়?
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
- তৃতীয় মেরু
