ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

মিয়ানমার জান্তার ‘সু চি কার্ড’ কাজে দেবে?

মিয়ানমার জান্তার ‘সু চি কার্ড’ কাজে দেবে?
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

নাফ নদের এপার থেকে দেখলে মিয়ানমারে গত তিন সপ্তাহে দুটি ‘পরিবর্তন’ ঘটেছে। প্রথমটি হলো, কারারুদ্ধ গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির সাজা ছয় বছর কমিয়ে দিয়েছে সামরিক জান্তা। পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা উপলক্ষে ‘ক্ষমাপ্রাপ্ত’ সাত হাজার বন্দির মধ্যে তিনিও রয়েছেন। যদিও তিনি এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না। কারণ জান্তার করা ১৯টি মামলার ৫টিতে ‘ক্ষমা’ পেলেও আরও ১৪টি মামলায় ২৭ বছর সাজা বহাল রয়েছে ৭৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে বলেছে, অং সান সু চি ইতোমধ্যে কারাগার থেকে রাজধানী নেপিদোর একটি আবাসিক ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁকে প্রথমে সরকারি বাসভবন, পরে অজ্ঞাত সামরিক ঘাঁটি হয়ে গত বছর জুনে নির্জন কারাকক্ষে নেওয়া হয়েছিল।

শুধু তাই নয়, গত ৯ জুলাই থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদউইনাই সু চির সঙ্গে দেখাও করতে পেরেছেন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার আয়োজনে। ১১-১২ জুলাই ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত আসিয়ানের সভায় তিনি সেই খবর ‘ব্রেক’ করে বলেছেন, সু চির ‘স্বাস্থ্য ভালো আছে; তিনি সংলাপে উৎসাহ দিয়েছেন।’

অং সান সু চির প্রতি সামরিক জান্তার হঠাৎ ‘সদয়’ হওয়ার কারণ কী? এর উত্তর রয়েছে দ্বিতীয় পরিবর্তনটির মধ্যে: সামরিক জান্তা পরিষদ বা ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল’ ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে জরুরি অবস্থার মেয়াদ চতুর্থবার বাড়িয়েছে।

২০০৮ সালে সেনাবাহিনী প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী মিয়ানমারে প্রাথমিকভাবে এক বছর এবং ‘প্রয়োজনে’ ছয় মাস করে আরও দু’বার জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ানো যায়। জরুরি অবস্থার সেই ‘সংবিধানসম্মত দুই বছর’ মেয়াদ চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। যে কারণে কোনো কোনো বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, জরুরি অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধির বদলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ঘোষণা আসবে।

আসেনি কেন? কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সশস্ত্র সংগ্রাম ও নিরস্ত্র আন্দোলনের অভূতপূর্ব ‘মোমেন্টাম’ বা মাহেন্দ্রক্ষণ সৃষ্টি হয়েছে। জোরালো প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সামরিক জান্তা। দেশটির তিন প্রধান ও প্রাচীনতম সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (কেএনএলএ), কারেন্নি আর্মি (কেএ) ও কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ) মনে করছে, অচিরেই সামরিক জান্তার পতন ঘটতে যাচ্ছে। মিয়ানমারের বিরোধী ও বিদ্রোহী সামারিক-বেসামরিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর বিকল্প সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ বা জাতীয় ঐক্য সরকারও বলছে– এই প্রথম জান্তা সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে প্রবল চাপের মুখে। তাদের পরাজয়ের একটি ‘ডিসাইসিভ’ বা এসপার-ওসপার মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে (দি ইরাবতী, ১৮ আগস্ট, ২০২৩)।

বস্তুত ৩১ জুলাই বৈঠকেই দেশটির বর্তমান সেনাপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী মিন অং লাইং স্বীকার করেছেন, অন্তত ১৩০টি ‘টাউনশিপ’ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। আরও ৫০টি টাউনশিপে চলছে সান্ধ্য আইন। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে মোট ৩৩০টি টাউনশিপ রয়েছে এবং এগুলো হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক ইউনিট। যেমন আমাদের প্রতিবেশী রাখাইন ও চিন স্টেটে রয়েছে যথাক্রমে ২০টি ও ৯টি টাউনশিপ। এগুলোর ১৮০টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার অর্থ হচ্ছে, দেশটির অর্ধেকই বিরোধী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দখলে।

জান্তাবিরোধী দল ও গোষ্ঠীগুলোর এবারের ঐক্যের অভূতপূর্ব চরিত্র বোঝা যেতে পারে মিয়ানমারের ‘স্টেট’ বা রাজ্য ও ‘রিজিয়ন’ বা অঞ্চল বিভাজন দিয়েও। স্টেট ও রিজিয়নের প্রশাসনিক গঠন অভিন্ন; পার্থক্য কেবল নৃগোষ্ঠীগত। দেশটির বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী ‘বামার’ অধ্যুষিত বৃহত্তর প্রশাসনিক ইউনিটগুলো ‘রিজিয়ন’ নামে পরিচিত; যেমন– রেঙ্গুন রিজিয়ন, ইরাবতী রিজিয়ন, মান্দালয় রিজিয়ন। অন্যান্য বৃহত্তর নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল ‘স্টেট’। যেমন রাখাইন স্টেট, চিন স্টেট, কাচেন স্টেট, কারেন স্টেট।

মিয়ানমারের স্বাধীনতার ৭৫ বছরের মধ্যে ৫৫ বছরই যে সামরিক শাসন চলতে পেরেছে, এর নেপথ্যে ছিল বিভিন্ন স্টেট ও রিজিয়নের মধ্যে নৃগোষ্ঠীগত বিভক্তি। মূলত বামার নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত সেনাবাহিনী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনের সুযোগ নিয়ে কিংবা আরও উস্কে দিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম স্বৈরশাসন চালিয়ে গেছে। আর গত তিন দশকে যখন সহিংস পথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, সু চিকে ‘মুক্তি’ দিয়ে অহিংস কৌশল কাজে লাগাতে চেয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে অং সান সু চি - ফাইল ছবি

যেমন ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে সু চি প্রথমবার গৃহবন্দি হয়েছিলেন। আন্দোলন সামাল দিতে ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে আবার গৃহবন্দি হলে মূলত জাতিসংঘের চাপে ২০০২ সালের মে মাসে মুক্তি পান। ২০০৩ সালের মে মাসে আবার গোপন কারাগারে নেওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ বেড়ে গেলে তাঁকে তিন মাস পর গৃহবন্দি করা হয়। ২০০৭ সালের আগস্টে বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রযোজিত ‘গেরুয়া বিপ্লব’ শুরু ও তীব্র গতি পেলে সেপ্টেম্বরে সু চিকে বাড়ির প্রধান ফটকে নিয়মিত বক্তব্য রাখার ‘স্বাধীনতা’ দেওয়া হয়। সেটা দেখে বেশির ভাগ আন্দোলনকারী ঘরে ফিরে গেলে রাজপথে থাকা অবশিষ্টাংশকে হত্যা ও নির্যাতনে ছত্রভঙ্গ করে দেয় জান্তা। এক পর্যায়ে ঘরে-বাইরে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হলে ২০১০ সালের নভেম্বরে সু চি মুক্তি ও রাজনীতির সুযোগ পান। তাঁর দল ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে সরকার গঠন করে। ২০২০ সালের নভেম্বরে আরও বড় ব্যবধানে জিতলেও মাত্র তিন মাসের মাথায় সেনা অভ্যুত্থান ঘটে।

এবারও যখন সশস্ত্র সংগ্রাম প্রবল হয়ে উঠেছে; বিরোধীদের নজিরবিহীন ঐক্য ও প্রতিরোধের মুখে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি যখন কাজে দিচ্ছে না; ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও যখন প্রতিরোধ দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না; তখন সামরিক জান্তা সু চিকে ‘মুক্তি’ দেওয়ার পুরোনো কৌশল বেছে নিয়েছে। ‘মিয়ানমার নাউ’ এর নাম দিয়েছে ‘সু চি কার্ড’।

প্রশ্ন হচ্ছে, এবার ‘সু চি কার্ড’ কতটা কাজে দেবে? ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ ইতোমধ্যে বলে দিয়েছে, সু চির সঙ্গে বৈঠক জান্তার ‘খেলা’ মাত্র। সংলাপের যে বার্তা থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়ে এসেছেন, সেটাও ‘গভীর সন্দেহজনক’। ওদিকে অতীতের মতো বর্তমান সংগ্রাম ও আন্দোলন সু চি মনোনীত কোনো এক-দুই ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং সামরিক বাহিনীর বাইরে সব গোষ্ঠী, দল ও আঞ্চলিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। খোদ সু চিও আর এই আন্দোলনের ‘একমাত্র প্রেরণা’ নন। তাঁর মুক্তি নিশ্চয় এখনও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেটা প্রতীকী অর্থে। চলমান আন্দোলনের প্রধানতম এজেন্ডা হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

এদিকে শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ক্ষমতায় যাওয়ার আগের ভাবমূর্তি সামান্যই ধরে রাখতে পেরেছেন সু চি। বিশেষত তিনি যেভাবে রোহিঙ্গা গণহত্যার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং এই প্রশ্নে তাঁর বন্ধুদের অবস্থান ও অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন, এমনকি কারও কারও ওপর ব্যক্তিগতভাবে চড়াও হয়েছেন, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। আর যাই হোক, জান্তার ‘সু চি কার্ড’ এবার আর কাজে দেবে না।

এখন রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জুড়ে যাওয়া বাংলাদেশ কী করবে? দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সবাই যখন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিভিন্ন দেশের নড়াচড়া নিয়ে গভীর মনোযোগী, তখন প্রতিবেশী দেশটির অভূতপূর্ব পরিস্থিতিও কিছুটা মনোযোগ দাবি করে বৈকি।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

 [email protected]

আরও পড়ুন

×