ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাঠহীন বিদ্যালয় ও শৈশব

মাঠহীন বিদ্যালয় ও শৈশব
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

সিলেট বিভাগের ৫ সহস্রাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশেরই খেলার মাঠ না থাকিবার যেই চিত্র সোমবারের সমকালে উঠিয়া আসিয়াছে, উহা ‘নিমজ্জিত হিমশৈলের দৃশ্যমান চূড়া’ মাত্র।

চলতি বৎসরের মে মাসে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছিল, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশেরই খেলার মাঠ নাই। অবশ্য মাঠ থাকিলেই যে উহা শিশুদের খেলাধুলার উপযোগী কিংবা অবারিত থাকিবে– সেই নিশ্চয়তা নাই। রাজধানীতে যদ্রূপ কোনো কোনো মাঠে ঢাকা ওয়াসা পানির পাম্প স্থাপন করিয়া উৎকর্ষ ও উপযোগিতা বিনষ্ট করিয়াছে; তদ্রূপ সিলেটেও মাঠ দখল কিংবা সংকুচিত করিয়া বিদ্যালয় ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনার প্রতিষ্ঠা দৃশ্যমান। আমরা আশঙ্কা করি, গ্রাম ও নগর নির্বিশেষে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের পরিস্থিতিও তথৈবচ। পরিস্থিতি অনুধাবনে পাত্রের সকল ভাত টিপিয়া দেখিতে হয় না।

আমরা জানি, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা। ইহার বাহিরে সমাবেশ ও সামাজিকীকরণ, স্বাস্থ্যচর্চা, এমনকি চিত্তবিনোদন ও অবসর কাটাইবার জন্যও মাঠের অনিবার্যতা অনস্বীকার্য। যেই কারণে আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যালয় ও মাঠ অবিচ্ছেদ্য ব্যবস্থা বিবেচিত হইয়া থাকে। বিশেষ করিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের তুলনায় উহার বাহিরের শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করিয়া থাকেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁহার ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে শুধু ‘দেহের পরিমাণে গৃহ নির্মাণ’কে নিরুৎসাহিত করিয়াছেন। কারণ উহাতে ‘স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়’। কিন্তু খোদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত সর্বশেষ বার্ষিক জরিপে দেখা গিয়াছে, দেশের প্রায় ১১ সহস্র সরকারি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নাই।

স্মরণে রাখিতে হইবে, মাঠ না থাকিবার এই চিত্র শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের। ঐগুলির বাহিরে আরও অর্ধলক্ষাধিক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রহিয়াছে। সেইগুলির বিপুল অধিকাংশেরই মাঠ দূরে থাকুক, নিজস্ব ভবনও নাই। সেই সকল বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রশ্নটি উহ্য থাকিতে পারে না।

স্বীকার্য, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাঞ্জল ভাষায় বলা হইয়াছে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার লক্ষ্যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া ও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। গত বৎসর মে মাসে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খেলার মাঠের প্রয়োজনীয়তা পুর্নব্যক্ত করিয়াছেন। চলতি অর্থবৎসরের জাতীয় বাজেটে ১০ সহস্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ উন্নয়ন প্রকল্পের কথা বলা হইয়াছে।

আমরা দেখিতে চাহি, নীতিগত এই অবস্থান মাঠ পর্যায়েও বাস্তবায়িত হইতেছে।

আমাদের শিশুরা যখন ক্রমবর্ধমান হারে ‘স্ক্রিনবন্দি’; পাড়ায় পাড়ায় ‘কিশোর গ্যাং’ গড়িয়া উঠিতেছে; বিদ্যালয়ে মাঠের ব্যবস্থা করিতে বিলম্ব তখন শিক্ষা মাঠে মারা যাইবারই নামান্তর।

আরও পড়ুন

×