ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

নদনদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও শঙ্কা

নদনদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও শঙ্কা
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

দেশে নদনদীর সংখ্যা কত? নদীবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা আয়োজনে প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকলে অবধারিতভাবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি অনেকবারই হয়েছি। বিশেষত খোদ সরকারি সংস্থাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য নাগরিক সংগঠন ও জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে বৈ কমায়নি।

এ প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো নদনদীর চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণে উদ্যোগী হওয়ার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সাধুবাদ পেতে পারে। বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উদ্যোগী ছিলেন। গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিকভাবে যাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। যদিও ব্যস্ততাহেতু এই কর্মযজ্ঞে যুক্ত হতে পারিনি। 

যাহোক, কয়েক দফা আলোচনা ও কর্মশালা শেষে গত ১০ আগস্ট নদী কমিশনের ওয়েবসাইটে নদনদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। জনসাধারণকে মতামত ও পরামর্শ প্রদানের জন্য দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে নদনদীর সংখ্যা প্রাথমিকভাবে ৯০৭টি নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ধরনের জলাধার বা জলাভূমিকে ‘নদী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? তার মানে, সংখ্যার আগে সংজ্ঞা নির্ধারণ জরুরি।

নদীর সংজ্ঞা

‘নদী’ কী– এ প্রশ্ন আজকের নয়। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের আগে ‘যাস্ক’ নামে একজন মুনি ও সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ প্রথম প্রশ্নটি তুলেছিলেন। তিনিই উত্তর দিয়েছিলেন– যা ‘নাদ্য’ অর্থাৎ নাদ বা শব্দ করে, সেটিই নদী। উনিশ শতকের ‘বাচস্পত্য অভিধান’ বলছে– ‘যে অকৃত্রিম জলপ্রবাহ ৯ মাইল ১৬০ গজ প্রবাহিত হয় নাই, তা গর্ত্ত শব্দবাচ্য।’ বাংলা একাডেমি প্রণীত অভিধানে রয়েছে নদীর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা- ‘পাহাড় হ্রদ প্রস্রবণ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন ও নানা জনপদের জলস্রোত; চার ক্রোশের অধিক বাহিনী জলনালি; স্বাভাবিক জলস্রোত; স্রোতস্বিনী; তটিনী; তরঙ্গিনী; প্রবাহিণী’। পরিহাসের বিষয় বটে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নদীর আইনি সংজ্ঞা নেই।

নদী, পানি ও পরিবেশ বিষয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও বিধিমালার মধ্যে প্রথম প্রণীত হয়েছিল ‘দ্য ক্যানেল অ্যাক্ট, ১৮৬৪’। সর্বশেষ ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে ‘বাংলাদেশ পানি আইন’। মাঝের দেড়শ বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নদী ও পানিসম্পদসংক্রান্ত অন্তত ৩১টি আইন ও বিধিমালা প্রণীত হয়েছে। কোথাও নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। এমনকি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনেও নেই নদীর সংজ্ঞা।

অবশ্য নদনদীর সংখ্যা নির্ধারণ করতে গিয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি ‘ওয়ার্কিং ডেফিনেশন’ নির্ধারণ করেছে। গত ২৭ আগস্ট এটিএন বাংলার ‘শুভ রাত্রি’ টকশোতে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সহ-আলোচক হিসেবে আমিও ছিলাম। সেখানে তিনি প্রথমবারের মতো সংজ্ঞাটি ‘পাবলিক’ করেছিলেন। ওই সংজ্ঞায় বলা হয়েছে– ‘নদ বা নদী বলিতে পাহাড়, পর্বত, হিমবাহ, হ্রদ, ঝরনা, ছড়া, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলধারা হইতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হইয়া যে জলধারা সারা বছর বা বছরের কোনো কোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়া প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হইয়া সমুদ্র, মহাসমুদ্র, হ্রদ, অন্য কোনো জলাশয় বা অন্য কোনো জলাশয়ে পতিত হয়, তাহাকে বোঝায়।’

উচ্চ আদালতের একটি রায় অনুসরণে এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে– ‘উপর্যুক্ত সংজ্ঞায় যাহাই থাকুক না কেন, ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে, রিভিশনাল সার্ভে ও বাংলাদেশে রিভিশনাল সার্ভে রেকর্ডে নদ বা নদী হিসেবে যাহা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা নদ বা নদী হিসবে গণ্য হইবে।’

নদীর সংখ্যা

নদনদীর সংখ্যা নির্ধারণে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০০৫ সালে ‘পানিবিজ্ঞান’ গ্রন্থে শনাক্তকরণ নম্বরসহ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়, সেখানে নদনদীর সংখ্যা ছিল ৩১০টি। ২০১১ সালে পরবর্তী সংস্করণে ৪০৫টি নদনদীর কথা বলা হয়। অন্যদিকে স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা সংস্থা সিইজিআইএস বলছে, দেশে নদনদীর সংখ্যা ৪৪৫। পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক রচিত ‘বাংলাদেশের নদনদী’ গ্রন্থে (জনান্তিক/২০২০) বলা হয়েছে, দেশে নদীর সংখ্যা ১১৮২। ‘রিভারাইন পিপল’ থেকে আমরা দেশের নদনদীর তালিকা প্রণয়নের যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, সেখানে এই সংখ্যা রক্ষণশীলভাবেই ১২ শতাধিক। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় ৯০৭টি নদী যদিও সরকারি হিসাবগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ, পূর্ণাঙ্গ তালিকা সম্ভবত নয়।

সংজ্ঞা ও সংখ্যার শঙ্কা

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদনদীর যে সংজ্ঞা ও সংখ্যা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করেছে, সেটা সামনে রেখে দুটি শঙ্কা কাজ করে। প্রথমত, আইনমতে ও উচ্চ আদালতের আদেশবলে দেশের নদনদীসহ সব জলাশয় বা জলাভূমির ‘অভিভাবক’ নদী রক্ষা কমিশন যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে, সেটা আরও সর্বব্যাপ্ত হওয়া উচিত। অন্যথায় এই সংজ্ঞায়নকে ঢাল করে ভবিষ্যতে নদী বা জলাভূমি দখল ও দূষণ উৎসাহিত হতে পারে।

যেমন সংজ্ঞাটিতে কেবল ‘নদ বা নদী’ নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তাহলে নদীর অন্যান্য প্রতিশব্দ কী হবে? যেমন বাংলা একাডেমি অভিধানে উদ্ধৃত তটিনী, কল্লোলিনী, তরঙ্গিনী, স্রোতস্বিনী, প্রবাহনী প্রভৃতি ‘প্রমিত’ প্রতিশব্দ ছাড়াও নদীর অনেক লোকায়ত নাম রয়েছে। এর মধ্যে ‘গাঙ’ সবচেয়ে প্রচলিত। বলতে হবে খাল, খালী, খলা প্রভৃতি প্রতিশব্দের কথা। কারণ নদীকে তুচ্ছার্থে ‘খাল’ ডেকে কীভাবে মেরে ফেলা হয়, উদাহরণ কম নেই। নদীর আরও প্রতিশব্দের মধ্যে রয়েছে দোয়ানি, ভারানি, দোন। বিশেষত সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবাহিত প্রায় সব প্রবাহই ‘নদী’ নয়, এসব নামে পরিচিত। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, সংজ্ঞায় নদীর সব প্রতিশব্দই যোগ করা হোক।

পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নে বিভিন্ন নদীর উৎস ও মুখ সম্পর্কে আরও সতর্ক হতে হবে। যেমন এই তালিকার ৬৮৩ নম্বরে থাকা বুড়িগঙ্গা নদীর উৎস হিসেবে তুরাগ নদকে দেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে বুড়িগঙ্গার উৎস হচ্ছে ধলেশ্বরী। এখন দখল ও প্রবাহস্বল্পতায় বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বলে সেই অংশ বাদ যাবে? তাহলে তো দখলই স্বীকৃতি পাবে!

তালিকায় নদীগুলোকে যেভাবে বিভাগ ও জেলায় ভাগ করা হয়েছে, সেটিও নদীবিজ্ঞানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ এ দেশে বেশির ভাগ নদীই প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণ করেছে। সে ক্ষেত্রে সীমান্ত নদীটি কোন বিভাগ বা জেলার হবে? যেমন গড়াই বা মধুমতী বা কালীগঙ্গা বা বলেশ্বর অভিন্ন নদী। এটি বিভিন্ন পয়েন্টে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল বিভাগের সীমানা নির্ধারণ করেছে। এই নদী কোন বিভাগের? যেমন উত্তরবঙ্গের ছোট্ট কিন্তু ‘আন্তর্জাতিক’ নদী জিঞ্জিরাম কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলা শুধু নয়; দুই বিভাগ– রংপুর ও ঢাকার মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীর প্রশাসনিক এলাকা কোনটি?

নদী রক্ষা কমিশনের উচিত হবে অববাহিকা অনুযায়ী নদনদীর তালিকা করা। ভৌগোলিকভাবে ও জলপ্রবাহগত দিক থেকেও চট্টগ্রাম অঞ্চলের কয়েকটি ছাড়া দেশের সব নদীই তিনটি বড় অববাহিকায় বিভক্ত– গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা। কিন্তু নদী কমিশনের তালিকায় যেভাবে বিভাগ ধরে তালিকা হয়েছে, সেটি একই অববাহিকার নদনদীকে কৃত্রিমভাবে বিভক্ত করে ফেলবে। এ ছাড়া নতুন বিভাগ যখন গঠিত হবে তখন কী দাঁড়াবে?

এ তালিকার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এখানে সুন্দরবনে প্রবাহিত সব নদী যুক্ত হয়নি। অথচ ওই বনে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক নদী বিভিন্ন নামে প্রবাহিত হয়েছে। অনেক সময় যে কারণে আমি লিখেছি ‘সুন্দর নদীর বন’।

উপসংহার

দেশে নদীর সংখ্যা নির্ধারণের কাজটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।  এর আগে একটি উপযুক্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি, যার ভিত্তিতে ‘নদী’ চিহ্নিত হবে। অন্যথায় অনেক নদীই শুধু সংজ্ঞায় না পড়ার কারণে, ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ার কারণে বাদ পড়ে যাবে।

নদী কমিশনের প্রতি আরেকটি অযাচিত পরামর্শ হচ্ছে– আরেকটু সময় নিয়ে, সামাজিক গবেষণার নিয়মগুলো মেনেই একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণীত হোক। প্রয়োজনে এ ধরনের কাজে আরও অভিজ্ঞ ও একাডেমিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের যুক্ত করা যেতে পারে। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে যাতে প্রশ্ন থেকে না যায়। দেরি হোক, কিন্তু দারুণ কিছু হোক!

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×