পরামর্শ
টাকার প্রেমে পড়লে কি নষ্ট হয়ে যাবেন?
সাইফুল হোসেন
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ২৩:০৮
মানুষ প্রতিনিয়ত প্রেমে পড়ে। একজন মানুষ আরেকজনের প্রেমে পড়ে। কেউ প্রকৃতির প্রেমে পড়ে। আবার অনেক মানুষ আছে যারা টাকার প্রেমে পড়ে। যে যার প্রেমে পড়ে, তাকে সে কাছে টানে; খুব আপন করে কাছে পেতে চায়। আপনি যদি টাকার প্রেমে না পড়েন তাহলে ধনী হতে পারবেন না। ধনী হতে হলে আপনার টাকার প্রেমে পড়তে হবে; টাকাকে কাছে টানতে হবে। টাকাকে প্রচণ্ডভাবে ভালোবাসতে হবে।
এবার প্রশ্ন– আপনার আকাশ-সমান টাকা দরকার কিনা। যদি আপনি আকাশ-সমান টাকা ব্যয় ও ব্যবহার করার পরিকল্পনা করতে পারেন, তাহলে আকাশ-সমান টাকা আয় করার স্বপ্ন দেখুন, আয় করুন; অসুবিধা নেই, তবে পরিকল্পনা থাকতে হবে। আপনি অবশ্য টাকাকে অপছন্দ করতে পারেন। কিন্তু দেখবেন, যে ব্যক্তি টাকাকে অপছন্দ করে; সব সময় টাকার প্রতি নেগেটিভ থাকে, টাকা তাঁর কাছে আসে না।
হিন্দু ধর্মে টাকাকে বলা হয়েছে দেবী লক্ষ্মী। যারা টাকা-পয়সা চায়, দেবী লক্ষ্মী তার হাতে ধরা দেয়। যারা চায় না, তার হাতে ধরা দেয় না। আপনি যদি টাকাকে ভালো না বাসেন, তাহলে টাকা আপনার থেকে দূরে থাকবে। ঠিক যেমন, আপনি যদি কোনো মানুষকে ভালো না বাসেন, সে আপনার সামনে আসবে না এক সময় দূরে চলে যাবে। টাকার সঙ্গে আপনার একটা ভালোবাসার সম্পর্ক থাকতে হবে। এই সম্পর্ক যত আপনি মজবুত করবেন, তত টাকার প্রতি আপনার ভালোবাসা বাড়বে। টাকার প্রতি আপনি আগ্রহী হয়ে উঠবেন।
বিশেষ করে যারা বড় ব্যবসায়ী হতে চান, তাদের টাকার প্রতি ভালোবাসা নিগূঢ় হতে হবে। যারা টাকাকে পছন্দ করেন না, তারা ভালো ব্যবসায়ী হতে পারবেন না। অনেকে সারাজীবন চাকরি করেছেন টেকনোলজি নিয়ে। পরে চিন্তা করলেন, টেকনোলজি নিয়ে একটা ব্যবসা করি। তাদের মূল ফোকাস কিন্তু টেকনোলজি; টাকা নয়। ফলে দেখবেন, তারা চলতে চলতে মুখ থুবড়ে পড়ছেন; সফল হতে পারছেন না। টাকা আয় করতে পারছেন না।
আবার অনেকে আছেন সমাজের জন্য কিছু করার জন্য ব্যবসা করতে চান, কিন্তু টাকার প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। তিনি কিছু টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেন। এক পর্যায়ে দেখলেন, টাকা তার হাতে ধরা দিচ্ছে না। ফলে তার যে অল্প টাকা আছে, সেই টাকা শুকিয়ে গেলে সেই ব্যবসা থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন। কথাগুলো তিক্ত মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি।
আবার অনেক মানুষ আছেন, অনুভব করেন যে তাদের অনেক টাকা দরকার। কারণ তারা দেশের জন্য কিছু করতে চান সত্যিকার অর্থে এবং তারা বোঝেন, দেশের জন্য কিছু করতে হলে টাকার দরকার। জন ডি রকফেলারের সম্পত্তি সমাজের অনেক উপকারে এসেছিল। তাঁর স্মরণীয় অবদান ১৯১৩ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা। ২০০৪ সালে ফাউন্ডেশনটির অর্জিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। সে বছর এই ফাউন্ডেশনের ফান্ড থেকে অনুদান, ফেলোশিপ প্রদানসহ বিভিন্ন কাজে প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়।
যারা বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন, তাদের একটা উদ্দেশ্য ছিল। সেটা হচ্ছে সমাজের উপকার এবং হিউজ ইউজ অ্যামাউন্ট তারা এই সমাজে ডোনেট করেছেন। আমরা জানি, ওয়ারেন বাফেট কী পরিমাণ ডোনেট করেছেন? তাঁর সম্পদের সিংহভাগ তিনি ডোনেট করে দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিনি ডোনেট করেছেন ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
দেখতে হবে, আপনার টাকা উপার্জনের উদ্দেশ্য কী? আপনার উপার্জনের উদ্দেশ্য যদি হয়, আপনি অসৎ কাজ করবেন; বড় রাজনৈতিক নেতা হবেন, অন্যায়ভাবে অথবা টাকার প্রতি আপনার প্রচণ্ড লোভ; কারণ আপনি ভোগলিপ্সায় প্রচণ্ডভাবে ব্যস্ত, তাহলে এই টাকা আপনার জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু যদি আপনি ধনী এবং সুস্থ ব্যবসায়ী হতে চান, তাহলে টাকার প্রতি প্রেম থাকতে হবে। কারণ এই প্রেমই আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে ব্যবসা বড় করার দিকে। এই প্রেমই টেনে নিয়ে যাবে আপনার সমৃদ্ধিতে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে এই টাকা সৎ উপায়ে, সৎ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন করতে হবে। এই টাকার প্রতি প্রেম মানে আমি বলি না, ঘুষ খেয়ে; সরকারের কর ফাঁকি দিয়ে অনেক টাকার মালিক হতে হবে। এই টাকা হতে হবে সুষ্ঠুভাবে, সৎ উপায়ে উপার্জিত এবং ব্যবসাই একমাত্র জায়গা, যেখানে সুষ্ঠুভাবে নিয়ম-নীতি মেনে অনেক টাকা আয় করা সম্ভব। টাকাকে ভালোবাসতে হবে নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকেই। আর যারা টাকার প্রতি সেই ভালোবাসা অনুভব করেন না, তাদের ব্যবসা না করাই ভালো। আপনার কি মনে হয়, আপনি পারবেন?
সাইফুল হোসেন: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট
