ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তৃতীয় মেরু

তিস্তা চুক্তি নিয়ে কেন কথাই হলো না?

তিস্তা চুক্তি নিয়ে কেন কথাই হলো না?
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরের উপলক্ষ যদিও ছিল জি২০ সম্মেলন; দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যু বিশেষত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা ছিল বহুল প্রত্যাশিত। বাস্তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিস্তা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়নি। অবশ্য দেড় ঘণ্টার বেশি সময়ের ওই বৈঠকের অন্তত আধা ঘণ্টা দুই প্রধানমন্ত্রী ‘ওয়ান অন ওয়ান’ কথা বলেছেন। সেই আলোচ্যসূচি অন্যদের জানার অবকাশ নেই। সব মিলিয়ে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি তিস্তা প্রসঙ্গে যেন রবীন্দ্রসংগীতের সেই চরণ হয়ে থাকল– ‘অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি’।

সেই ‘অনেক কথা’ কী? প্রথমত, তিস্তা দূর কি বাত, বৈঠকে আলোচনার বিষয় নিয়েও ভারতীয় পক্ষের কেউ সংবাদমাধ্যমে সরাসরি কথা বলেননি। তার মানে, ইস্যুটি এড়িয়ে যেতেই চেয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইসহ ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনই উদ্ধৃত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তিস্তাসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।’ (সমকাল, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩)

দ্বিতীয়ত, বৈঠকটি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথারীতি ‘টুইট’ করেছেন। বৈঠকের চারটি ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। গত ৯ বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অগ্রগতি খুবই সন্তোষজনক। আমাদের আলোচনায় কানেকটিভিটি, বাণিজ্যিক সংযুক্তি এবং অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ 

বৈঠক নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও কানেকটিভিটি, পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, জনযোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বন্ধন উন্নয়ন সহযোগিতা, সংস্কৃতি এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।’

লক্ষণীয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অন্তত ‘পানিসম্পদ’ নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর টুইটে তাও নেই। ধরে নিতে পারি, ‘পানিসম্পদ’ ডাকনামে আসলে তিস্তা ইস্যু নিয়েই আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আলোচনা যে কোনো সমাধান নয়; গত এক যুগে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিগুলো তার প্রমাণ।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই বৈঠকে তিস্তার প্রসঙ্গটি এলো কীভাবে? কীভাবে আমরা ধরে নিলাম, এক যুগ ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা ইস্যুটি একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনের ‘সাইড লাইনে’ অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সমাধান হবে?

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে অনেক বিষয় স্থান পাবে। তবে আলোচনায় অবশ্যই তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি তোলা হবে।’ (সমকাল, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।

এর আগে, গত ২ আগস্ট তিস্তা অববাহিকার রংপুর সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে ও বিপক্ষে মত প্রবল। প্রকল্পটির প্রণয়ন ও অর্থায়নে চীনের সম্পৃক্ততার ‘গুঞ্জন’ থাকায় বিষয়টি ভূরাজনৈতিক ইস্যুও হয়ে উঠেছে। যদিও সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য নেই। অনেকে আশা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী এবার ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র ঘোষণা দেবেন। কিন্তু জিলা স্কুল মাঠের বিশাল জনসভায়  তিনি অতি সংক্ষেপে বলেছেন- ‘সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রংপুর বিভাগে খাল খননের কাজ, নদী ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। যেগুলো হয়ে গেছে, সেখানে আর সেচের জন্য কোনো কষ্ট হয় না। সেই সঙ্গে আমাদের তিস্তা মহাপরিকল্পনা– সেটাও আমরা বাস্তবায়ন করব।’

ওদিকে গত ২৫ জুলাই ভারতের আইনসভার দুই কক্ষ লোকসভা ও রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। সেখানে তিস্তা প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকার বিষয়ে এই কমিটি জ্ঞাত। কমিটি মনে করে, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি যত দ্রুত সম্ভব নিষ্পন্ন করা দরকার। এই কমিটি ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলছে যে, তিস্তা ইস্যুতে যখনই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হবে, চুক্তিটি স্বাক্ষর করার ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনটি সম্পর্কে বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট আশাবাদের সঞ্চার হয়। এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সেহেলি সাবরীন সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এটা নিশ্চিতভাবেই উৎসাহব্যঞ্জক ও সারবস্তুসম্পন্ন; বিশেষত ভারতের সব রাজনৈতিক দলের সদস্যই যখন এই কমিটিতে রয়েছেন। যে কারণে এ ধরনের সুপারিশ আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে।’ (ডেইলি স্টার, ৩ আগস্ট ২০২৩)

ভারতের নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের যারা বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রত্যাশা করেন, তারাও উৎসাহিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ আমার সঙ্গে কথাও বলেছেন। যখন খুব একটা আশাবাদী হতে পারিনি; তখন তারা এই বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ২৭ সদস্যের এই কমিটিতে কংগ্রেস সরকারের সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম, তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রভাবশালী নেতা স্বপন দাশগুপ্ত রয়েছেন। বিশেষত ‘সর্বাংশে প্রস্তুত’ তিস্তা চুক্তির স্বাক্ষর প্রক্রিয়া আটকে আছে যে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর আপত্তিতে, তাঁর দক্ষিণ হস্ত ও ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হয়েছে।

তবুও, সাত দশক ধরে ঝুলে থাকা একটি ইস্যু স্থায়ী কমিটির এক প্রতিবেদনেই সমাধান হয়ে যাবে– এতটা আশাবাদী হতে পারছি না। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তাগিদ নিশ্চয়ই ইতিবাচক লক্ষণ, কিন্তু ‘মুভার’ নয়। চলতি বছরের শেষে সীমান্তের দুই পাশেই সাধারণ নির্বাচন রয়েছে বলে নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হতে পারে বড়জোর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর সামনে রেখে সীমান্তের দুই পাড়ে আশাবাদ এবং বৈঠকের পরের বাস্তবতায় আরেকবার প্রমাণ হলো– গত এক যুগে ভারতের দিক থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। জি২০ সম্মেলনে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত নৈশভোজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাতের বিষয়টিই ধরা যাক। দুই দেশের সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছিল, দু’জনের দেখা এবং তিস্তা নিয়ে কথাও হতে পারে। আখেরে আনন্দবাজার ও হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা জানিয়েছে, দু’জনের কুশল বিনিময় হয়েছে বটে, তিস্তা নিয়ে কথা হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সময় পেলে একবার কলকাতা আসুন, অনেক কথা হবে।’ আর শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘আপনিও একবার ঢাকায় আসুন, খুব ভালো লাগবে।’

হায়, তিস্তা চুক্তির জন্য আমরা আর কত ঢাকা-কলকাতা করব! বিষয়টি আসলে ঢাকা ও দিল্লির। প্রয়োজন ভারতীয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি আটকে থাকার বিষয়টি যে নেহাত খোঁড়া যুক্তি– ২০১৯ সালে পাস হওয়া ভারতের ‘নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন’ দিয়েই তা বোঝা যায়। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের আপত্তি অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকার যদি ওই আইন করতে পারে; পররাষ্ট্রের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত তিস্তার পানি বণ্টনবিষয়ক ন্যায্য চুক্তিটি করতে পারবে না?

তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বিষয়ে এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ থেকেই আবার ধার করি– ভারতের কথা বোঝার আশা জলাঞ্জলি দিয়ে বসে থাকলে হবে না।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×