জীবনকৌশল
শুয়ে শুয়ে কাজ করতে পারলেও আপনি ভালো ব্যবসায়ী
সাইফুল হোসেন
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
আপনি ব্যবসা করতে চান? কেউ বলেন, ব্যবসা করা প্রচণ্ড কঠিন কাজ। আবার কেউ বলেন, ব্যবসা করা সহজ। আপনি কী মনে করেন? সত্যি কথা বলতে, যারা চাকরি করেন তারা মূলত ব্যবসা করার উপযোগী নন। হ্যাঁ, যারা চাকরি করেছেন লম্বা সময় ধরে, তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসা করছেন এবং কেউ কেউ সফলও হয়েছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা অনেক কম। কারণ চাকরি করার মানসিকতা আর ব্যবসা করার মানসিকতা সম্পূর্ণ আলাদা। চাকরি করবেন, কোনো ঝামেলা নেই আপনার। সকালে ঘুম থেকে উঠবেন, ফ্রেশ হবেন, রেডি হয়ে অফিসে যাবেন। সবকিছু আপনার জন্য তৈরি। সেখানে কী কী কাজ করবেন, সেটাও আপনার জন্য নির্ধারিত। কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার সময় হলে আপনি বাসায় চলে আসবেন।
ভালো একজন উদ্যোক্তা কীভাবে হতে হবে, সে ব্যাপারে উদ্দীপনা পুরো সমাজেই কম। আমাদের সমাজে যেসব ব্যবসায়ী বড় হয়েছেন বা এখনও বড় হচ্ছেন, ব্যবসা করছেন, তাদের কিন্তু নিজের প্রচেষ্টায় ব্যবসা করতে হচ্ছে। সমাজে তাদের প্রয়োজনীয়তা অনেক হলেও সমাজ তাদের কার্যকরভাবে অনুপ্রেরণা দেয়নি। এই অনুপ্রেরণা এসেছে মূলত তাদের মনের গহিন থেকে। চাকরি আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে হয়তো খানিকটা নিরাপদ করে। কিন্তু ব্যবসা আপনাকে অনেক বড় হতে সাহায্য করে; অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে; দেশ গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে।
আজ আমরা মূলত একটি নতুন কথার অবতারণা করতে যাচ্ছি। কথাটি হচ্ছে, আপনি যদি শুয়ে শুয়েও কাজ করতে না পারেন, তাহলে আর যা-ই কিছু হন না কেন, ভালো ব্যবসায়ী হতে পারবেন না। কথাটি একটু পর্যালোচনার দাবি রাখে। মনে রাখা দরকার, ব্যবসা অত সহজ ব্যাপার নয়।
অনেকে প্রশ্ন করবেন, শুয়ে শুয়ে কাজ করতে হবে– মানে কী? যারা ব্যবসায়ী তারা মূলত ২৪ ঘণ্টা ব্যবসায়ী। কিন্তু চাকরিজীবীরা ২৪ ঘণ্টা চাকরিজীবী নন। তারা শুধু যে সময়টা চাকরি করেন, সেই সময়টুকু কাজ করেন। ব্যবসায়ীকে প্রতি মুহূর্তে কাজ করতে হয়। শুয়ে থাকলেও তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। শুয়ে শুয়ে তাঁকে পরবর্তী দিন কী করবেন সেই পরিকল্পনা করতে হয়। যদি শ্রমিক বা কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারেন তাহলে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে হয়– এই টাকাটার ব্যবস্থা কীভাবে করতে হবে; ব্যবসার মধ্যে সমস্যা হচ্ছে, এটা কীভাবে সমাধান করা যাবে। এ চিন্তা যদি করতে না পারেন; শুয়ে শুয়ে যদি পরিকল্পনা করার সক্ষমতা না থাকে; যদি কাজ করার ইচ্ছে না থাকে, তাহলে আপনি অন্য সবকিছু হতে পারবেন কিন্তু সফল ব্যবসায়ী হতে পারবেন না।
ব্যবসার প্রথম এবং প্রধানতম করণীয় হচ্ছে, ভালো পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। তা বাস্তবায়নে অনেক পলিসি নির্ধারণ করতে হবে; লোকজন নিয়োগ করতে হবে; প্রডাক্ট প্রকিউর করতে হবে, বেচতে হবে ইত্যাদি।
এই যে কাজগুলো করবেন, সকালে উঠেই আপনাকে কাজ শুরু করতে হবে এবং এটা রাতে ভেবে ঠিক করে ফেলতে হবে। অনেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ডায়েরি নিয়ে বসেন। পরবর্তী দিনের ব্যবসার পরিকল্পনা নোট করে নেন, তারপর ঘুমাতে যান। অনেকে সেটা না করে মাথার মধ্যে ওটা নোট করতে থাকেন এবং সকালবেলা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন।
ব্যবসাতে নিজের উদ্ভাবন সাংঘাতিক কাজে লাগে। আপনার স্বাধীনতা এখানে পুরোপুরি ভোগ করবেন। চিন্তার প্রতিফলন আপনি কার্যক্ষেত্রে করবেন, কিন্তু চাকরিতে সেই সুযোগ খুব কম। চাকরিতে আপনি কী চিন্তা করছেন, সেটা খুব জরুরি বিষয় না। আপনাকে যে কাজটা দেওয়া হয়েছে, সেই কাজটা করতে হবে সুন্দর করে। সেখানেও যে ইনোভেশনের দরকার নেই, এমন নয়। কিন্তু ধরনটা আলাদা; ঠিক ব্যবসার মতো না।
ব্যবসায় আরও যেটা দরকার সেটা হচ্ছে, আপনাকে খুবই ধৈর্যশীল হতে হবে; ধাক্কা সামলানোর মানসিকতা থাকতে হবে; মনের প্রচণ্ড জোর থাকতে হবে। পড়ে যাবেন, আবার উঠে দাঁড়াতে হবে; সর্বশক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। আপনি চলতে পারছেন না, হয়তো পা চলছে না; তারপরও আপনাকে শক্তি সঞ্চয় করে আবার চলা শুরু করতে হবে।
আমি যে গুণাবলির কথা বললাম, এগুলো আপনার আছে কিনা দেখতে হবে। ব্যবসা করবেন, নাকি চাকরি– এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে পার্সোনালিটি প্রোফাইলিং করতে হবে। আপনি কোন ধরনের মানুষ তা জেনে নিতে হবে। তারপর যদি মনে করেন, আপনি ব্যবসার জন্য তৈরি, তাহলে ব্যবসা করবেন। আর যদি মনে হয়, চাকরি করা দরকার; তাহলে চাকরি করবেন।
অনেকে আছেন, এক রাত না ঘুমালে পরদিন আর উঠতে পারেন না। ব্যবসা করলে সেটা সম্ভব না। কারণ না ঘুমিয়েও পরদিন আবার ঠিক শক্তি নিয়ে কাজ করার মানসিকতা ও সক্ষমতা আপনার থাকতে হবে ব্যবসার ক্ষেত্রে। মূল যে বিষয় সেটা হচ্ছে, ভেবে দেখুন, আপনার অনেক গুণ আছে, কিন্তু শুয়ে শুয়ে কাজ করতে পারেন কিনা। যদি পারেন তাহলে আপনি ব্যবসায়ী হতে পারবেন। যদি না পারেন তাহলে ভাইজান বা প্রিয় বোন, ব্যবসা আপনার জন্য নয়।
সাইফুল হোসেন: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট; ইউটিউবার ও সিইও, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল
- বিষয় :
- জীবনকৌশল
- সাইফুল হোসেন
