কূটনীতি
সংকটের সুযোগে বাণিজ্য করে নিল ফ্রান্স?
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০
আফ্রিকার দেশে দেশে ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে। গত তিন বছরে একেক করে আফ্রিকার ৯টি দেশের স্বৈরশাসক উৎখাত হয়েছে। এই শাসকরা নিজ দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ না করে ফ্রান্সের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন। সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্সকে সেখান থেকে হাত গুটিয়ে আসতে হয়েছে। সংগত কারণেই অন্যের শক্তি-সম্পদে গড়ে তোলা ফ্রান্সের চাকচিক্য ও অর্থনীতিতে টান পড়েছে। এখন তাদের নজর দিতে হচ্ছে অন্যদিকে। কিন্তু সময়ও অনেক পাল্টেছে। উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোও তাদের বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির নানা সমীকরণ মিলিয়ে নিচ্ছে। যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংকট ও অস্থিরতা, সেখানে এই শক্তি নানা অজুহাতে প্রবেশ করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। বাংলাদেশে এমনই এক সুযোগ এসে যায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর কাছে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বিদেশিরা পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে নিজেদের স্বার্থ আদায়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের চাপ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এখানে তাদের পণ্য বিক্রি করতে চায়।’
নিজ দেশে ইমেজ সংকটে থাকা মাখোঁ এর মাধ্যমে হয়তো ইমেজ ঝালিয়ে নিলেন। বাণিজ্য বিস্তার নিয়ে তাদের আরও ভাবনা আছে। তার কিছু সংবাদ গণমাধ্যমেও এসেছে। রূপপুরের পরে বাংলাদেশে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সরবরাহ ইত্যাদি। ফ্রান্সের প্রযুক্তির সুনাম আছে। বাংলাদেশের কৃষি, রেল, পরিবেশের উন্নয়নে তাদের সে প্রযুক্তি কাজে লাগানো গেলে ভালো। উচ্চশিক্ষা, গবেষণায় সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা কতটুকু, কীভাবে হবে, সেটা নির্ভর করছে শাসকদের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ ও সমীকরণের ওপর।
চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে পশ্চিমা শক্তি নানা প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করছে এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে, বাড়াতে। মাখোঁর বাংলাদেশ সফর তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিটি এমন সময় সম্পাদিত হলো, যখন নির্বাচন প্রশ্নে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর বলে মনে হচ্ছে। তাহলে কি ফ্রান্সের সঙ্গে উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার পশ্চিমাদের মধ্যে মিত্র তৈরির চেষ্টা করছে?
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ধানমন্ডির এক গায়কের বাড়িতে লোকসংগীত শোনা, দেশীয় নৌকায় চড়া কিংবা শিঙাড়া খাওয়া কি বাণিজ্যিক চেহারাটা আড়ালের কৌশল? ফ্রান্সের প্রভাবশালী সংস্থা এএফডি বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ জানাবে; এটাই স্বাভাবিক। মাখোঁ বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। কিন্তু ফ্রান্সে ফিরে গিয়েই তিনি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফ্রান্স-জার্মান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট থেকেও অভিন্ন বিবৃতি প্রকাশ এবং উদ্বেগ জানিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। বিষয়টা কি স্ববিরোধিতা নয়? একদিকে সুযোগ বুঝে বিমান বেচার পাঁয়তারা, আবার দেশে ফিরে পশ্চিমা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের নিন্দা করা কি ফ্রান্সের দ্বিচারিতা নয়? মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের কথা বলে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে; তাদের অবস্থান প্রবল করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। সরকারের পছন্দমতো নির্বাচনী বোঝাপড়ার বিনিময়ে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থের নানা বিষয়ের কথা শোনা যায়। সময়ই বলবে সেই চাওয়া-পাওয়া, বোঝাপড়ার হিসাবনিকাশ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়নের প্রশংসা করে নিজ দেশে গিয়ে এ দেশের মানবাধিকারের যখন সমালোচনা করেন, তখন সত্যিই বিস্মিত হতে হয় তাঁর এই দ্বিচারিতায়! ড. মঞ্জুরে খোদা: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
