নগর পরিকল্পনা
ঢাকার জলজট কমাতে বিকল্প কৌশল খুঁজতে হবে
নাভিদ সালেহ
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০
ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা বহু পুরোনো একটি সমস্যা। এ জন্য নগরবাসীর দুর্ভোগ বছরের প্রায় অর্ধেকটা জুড়েই থাকে চরমে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের ইচ্ছা সবার। সরকারেরও ভাবনার অন্ত নেই। প্রকৌশলীদের চিন্তা ও সমাধান প্রস্তাবেরও শেষ নেই। তবে সমস্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। আমি বন্যা কিংবা পানিবিশারদ নই। তবে একজন পুরকৌশলী হিসেবে আমার সংগৃহীত জ্ঞান থেকে কিছু বিকল্প পথের প্রস্তাব করা যায়।
নিষ্কাশন করা না গেলে শহরের ভেতরে অতিরিক্ত পানি ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এগুলোকে বলা হয় ওয়েটল্যান্ড বা জলাভূমি। ঢাকার ভেতর হাতিরঝিলের আকারের কমপক্ষে ২০টি জলাভূমি থাকা দরকার বর্ষার জল ধারণ করার জন্য। অথচ গত কয়েক দশকে আমরা এক হাজারেরও বেশি পুকুর হারিয়েছি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।
জলাবদ্ধতা নিয়ে ভোগান্তি যখন বাড়ে তখন লেখালেখি চলে সংবাদপত্রে; টকশো হয় এ নিয়ে। সরকার ও তার সংস্থাগুলোকে দোষারোপ করা হয়; অপরিকল্পিত নগরায়ণকে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়; পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নতুন পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের পরামর্শ উঠে আসে। এগুলো দরকারি। তবে সমস্যার সমাধান কি হয়েছে আদৌ? প্রতিবন্ধকতা আসলে কোথায়? প্রযুক্তিগত বিকল্প নিয়ে কিছু লেখার আগে এটি বলে রাখা জরুরি– নগরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কিন্তু নগরবাসীর ওপরেও বর্তায়। নগরের জলাভূমির পরিচর্যা, প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস, প্লাস্টিক বর্জ্য নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। উন্নয়নের নামে ঝিল, পুকুর কিংবা খাল অবৈধভাবে দখল ও ভরাট না করার মতো সুনাগরিকসম ব্যবহার ঢাকাবাসীর কাছ থেকে আশা করা যেতেই পারে।
বিকল্প নাগরিক পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের মূল ভাবনা দুটি– ১. নিষ্কাশনযোগ্য পানির পরিমাণ কমাতে হবে, যাতে খাল ও পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর ওপর চাপ কমে। পাশাপাশি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন বহমান থাকে, বর্জ্যে আটকে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ২. এ কাজটি করতে হবে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী প্রকল্পের আওতায়। নিষ্কাশনক্ষম খালগুলোর ওপর পানির চাপ কমাতে বিশ্বে ‘টেকসই নগর নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা’ আর ‘সবুজ-নীল নগর অবকাঠামো’র মতো নতুন ধারণার অবতারণা হয়েছে। ভারতের কিছু অঞ্চল, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ধারার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে লোকসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নতুন দালান নির্মাণ। নির্মিত দালান ভূমির কিছু অংশ দখল করে নিচ্ছে বলে বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না। দালানের ছাদ বেয়ে পড়া বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠে গড়ানো পানিপ্রবাহ বা রানঅফে আরেকটি সংযোজন। অর্থাৎ দালান তৈরির একটি প্রত্যক্ষ ফল ভূগর্ভে পানি নিষ্কাশনের জায়গা হারানো এবং মাটির ওপর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি। পাশ্চাত্যে এই দ্বৈত সমস্যা সমাধানের জন্য দালানের ছাদে বৃষ্টির পানি আহরণ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘সবুজ ছাদ’ অর্থাৎ বাগানসমৃদ্ধ ছাদ নির্মিত হচ্ছে। এতে বৃষ্টির পানির কিছু অংশ যেমন নিষ্কাশনের প্রয়োজন পড়ছে না, অন্যদিকে সামান্য পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আহরিত বৃষ্টির পানিকে সুপেয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজউক নতুন দালান নির্মাণের নকশাতে এমনই সবুজ ছাদ ও বৃষ্টির জল আহরণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে পারে।
ভূমিতে পানি সরানোর জন্য রাজপথে নিষ্কাশনপ্রবণ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার বা নিষ্কাশন পথ উপস্থাপনার ধারণা নতুন নয়। পাশ্চাত্যে কিছু বিশেষ প্রজাতির গাছ রোপণ করা হচ্ছে, যা জৈব নিষ্কাশন বা বায়োড্রেনেজ কৌশল বাস্তবায়ন করছে। ইউক্যালিপটাস, ঝাউ, বাবলা, সুবাবুল গাছের শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং এসব গাছের বার্ষিক জল শোষণের ক্ষমতা প্রতি হেক্টরে ১৭ লাখ থেকে ৭৪ লাখ গ্যালন পর্যন্ত। মনে রাখতে হবে, স্থানীয় গাছ ব্যবহার করা টেকসই সমাধানের পূর্বশর্ত। তবে এ পন্থার একটি ফল হলো, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। তাই এই বিকল্প সমাধান বাস্তবায়ন করতে হবে ভেবেচিন্তে।
আরেকটি বিকল্প সমাধান হতে পারে রাজপথ থেকে সংগৃহীত বৃষ্টির পানি পুনর্ব্যবহার। এ ধরনের পানির গুণাগুণ নিশ্চয় সুপেয় পানির মতো নয়। তাই এ পানিকে ‘ধূসর জল’ হিসেবে, অর্থাৎ থালা-বাসন ধোয়া, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতেও সামগ্রিক পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর ওপর চাপ কমবে।
প্রশ্ন থেকে যায়, এই বহুমুখী পদ্ধতি সমন্বয় করার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ কৌশল কি অবলম্বন করা যেতে পারে? ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং তাঁর সহগবেষকরা ‘র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল’ পদ্ধতিতে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন একটি অর্থনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন, যাতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে সর্বোত্তম কৌশলটি শুধু প্রয়োগ করা যায়। এ ধারণা অনুকরণ করা যেতে পারে নগর ব্যবস্থাপনাতেও। অর্থাৎ ঢাকা এবং তৎসংলগ্ন এলাকার একটি মডেল তৈরি করে তার ওপর যে কোনো পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যেতে পারে। এমন মডেল তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীসংলগ্ন নিউ অরলিয়েন্স শহরে। ‘নদী পরীক্ষাকেন্দ্র’ নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অবস্থিত এ মডেলে মিসিসিপি নদী, ১২০টি পানি নিষ্কাশন পাম্প, নিউ অরলিয়েন্স শহরের বসতি, ব্রিজ, রাজপথ– সব ছোট আকারে তৈরি করা রয়েছে। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নির্ধারণ করা হয় কোন প্রযুক্তি বা কোন কৌশল অবলম্বনে শহরটিতে কী ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বা পানি নিষ্কাশন কতটা সফল হতে পারে। মডেল থেকে সংগৃহীত উপাত্ত গবেষকদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে এবং সবচেয়ে কার্যকর ধাপটি বাস্তবায়নের পথে এগোয়। ঢাকায় এমন ইকো-হাইড্রোলজিক মডেল তৈরির সময় এসেছে। এ ধরনের গবেষণা একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত নীতিনির্ধারণের পথ সুগম করবে।
আলবার্ট আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন, ‘যে ভাবনা থেকে আমরা সমস্যা তৈরি করেছি, সেই একই চিন্তা থেকে তার সমাধান আসবে না।’ ঢাকা একটি বৃহৎ শহর। এ শহরে নাগরিকের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমাগত। জলাবদ্ধতার পেছনে যেমন রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তেমনি রয়েছে জনগণের নাগরিক দায়িত্বে অবহেলা। এখন পর্যন্ত এর সমাধানে পুরোনো ধারার অপরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেই একমাত্র উপায় বলে ধরা হচ্ছে। এই স্থবির চিন্তা বদলাতে হবে। কার্যকর বিকল্প কৌশল খুঁজে নিতে হবে এই জলজট অতিক্রম করতে। নাভিদ সালেহ: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে পুর, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক
