হাওরে বিপর্যয়
খাদ্য নিরাপত্তা উদ্বেগ আমলে নিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:১৭ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১০:১৭
টানা বৃষ্টি ও উজান হইতে নামিয়া আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের সাত জেলার হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমির অর্ধপক্ব ধান জলমগ্ন হইবার ফলে উক্ত অঞ্চলে যেই দুর্যোগময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা সমগ্র জাতির জন্যই উদ্বেগের কারণ হইতে পারে। শনিবার প্রকাশিত সমকালের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞগণও অভিন্ন ধারণা ব্যক্ত করিয়াছেন।
তাহাদের মতে, মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশেরও অধিক পাওয়া যায় এই বোরো মৌসুমে, যাহার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন হয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার হাওরে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান দুর্যোগে হাওরাঞ্চলের মোট কৃষিজমির প্রায় ১২ শতাংশ তথা ৫০ সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হইয়াছে।
ইহাতে প্রায় আড়াই লক্ষ টন বোরো ধান কম উৎপাদন হইতে পারে। সংস্থাগুলির মতে, সমগ্র দেশে পূর্ববর্তী বৎসরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ অধিক জমিতে বোরো চাষ হওয়ায় হাওরের ঐ ক্ষতি ততটা বড় হইবে না। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলির মতে, ৮০ সহস্র হেক্টরের অধিক জমির ধান নিমজ্জিত।
স্মরণে রাখিতে হইবে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্য এলাকার তুলনায় অধিক ঘনত্বের কারণে হাওরাঞ্চলে সামান্য ক্ষতি হইলেও জাতীয় সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে হাওরে ধানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আদৌ উপেক্ষণীয় নহে। উপরন্তু প্রতিবেদন অনুসারে হাওরাঞ্চলে শ্রমিক সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করিয়াছে। গত বৎসরও তথায় একজন শ্রমিকের মজুরি ছিল ৫০০-৬০০ টাকা, এখন তাহা ১২শ হইতে দুই সহস্র টাকা। ফলে পূর্বের তিন কাঠা জমির ধান কর্তন ব্যয় দিয়া এখন এক কাঠাও ঠিকমতো কর্তন সম্ভব হইতেছে না। জ্বালানি সংকটের সহিত ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে হারভেস্টারের ব্যবহারও সীমিত। ইহার ভাড়াও এখন পূর্বাপেক্ষা তিন-চার গুণ। অন্যদিকে বাজারে ভিজা ধানের দাম মণপ্রতি ৭০০-৮০০ টাকা হইতে ইতোমধ্যে ৫০০-৬০০ টাকায় অবনমিত। সমস্যা
এইখানেই শেষ নহে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার উপরে বহিতেছে। আগামী কয়েক দিনে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রহিয়াছে। ইহাতে নূতন করিয়া ৭৭ সহস্রাধিক হেক্টর ধানি জমি প্লাবিত হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে।
ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, এক দশকের অধিক সময় যাবৎ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করা হইলেও চলমান অর্থবৎসরে ইতোমধ্যে ১২ লক্ষ টন চাউল আমদানি করিতে হইয়াছে। হাওরে ধানের ক্ষতি বর্ধিত আমদানিরও তাগিদ সৃষ্টি করিবে, যাহা অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় নিশ্চয় বাড়তি উদ্বেগের কারণ হইতে পারে। ইহাও মনে রাখিতে হইবে, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও নিজেদের চাহিদার জন্য বাজারের উপর নির্ভর করিতে হইতে পারে, যাহা স্থানীয় বাজারে নূতন চাপ সৃষ্টি করিবে। সামগ্রিকভাবে হাওরের বিপর্যয়ে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় উদ্বেগ রহিয়াই গেল।
আমরা জানি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, ধান শুকানোর ব্যবস্থা, সরাসরি সংগ্রহ কার্যক্রমসহ ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে সরকার। কিন্তু তজ্জন্য যেই পরিকল্পনা দরকার, তাহা দৃশ্যমান নহে। খাদ্য অধিদপ্তর শুকনা ধান সংগ্রহ করিতেছে, যথায় বিশেষত ছোট-মাঝারি কৃষকের কোনো লাভ নাই। কারণ কাঁচা ধান বিক্রয় করিয়াই তাহাদের উৎপাদন বাবদ গৃহীত ঋণ পরিশোধ এবং সংসারকার্য নির্বাহে অর্থ সংগ্রহ করিতে হইতেছে। বরং প্রণোদনা পাইলে কৃষক জরুরি ব্যয় হইতে কিছুটা হইলেও স্বস্তি এবং ধান শুকাইবার সময় পাইত। আর যাহারা ক্ষতিগ্রস্ত; নির্ধারিত ক্রয়মূল্যের মাধ্যমে সেই কৃষকদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
