রাবিতে সাংবাদিক আক্রান্ত
ক্ষমতা বদলাইলেও ক্ষতিচর্চা বহাল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার পীঠস্থান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের উপর ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নৃশংস ও ন্যাক্কারজনক হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন ও বিক্ষুব্ধ। বস্তুত ইহা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই উন্মোচিত করিয়াছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার রাত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সম্মুখে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া ছাত্রদলের নেতাকর্মী সমকালসহ কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিনিধির উপর হামলা চালাইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সহিংসতা এই দেশে নূতন নহে। কিন্তু সাংবাদিকদের যেইভাবে বেধড়ক প্রহারে মস্তক দীর্ণ করা হইয়াছে; এমনকি পুঁতিয়া ফেলিবার ন্যায় প্রকাশ্য হুমকি প্রদান করা হইয়াছে, উহা হামলাকারীর অন্তর্গত অপরাধপ্রবণতাই তুলিয়া ধরে। সামাজিক মাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করিয়া যেইভাবে ছাত্রদল সশস্ত্র মহড়া ও সহিংসতা চালাইয়াছে, উহাও সুস্থ ছাত্র রাজনীতির লক্ষণ হইতে পারে না। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হস্তে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটের ন্যায় অস্ত্রশস্ত্রের উন্মুক্ত উপস্থিতি শিক্ষাঙ্গনকে আতঙ্কের অকুস্থলে পরিণত করিয়াছে। ইহাও স্পষ্ট যে, ছয় মাস পূর্বে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির ছাত্র সংগঠনটি ইতিহাস হইতে শিক্ষা গ্রহণ করে নাই। যেই কারণে ক্ষমতা বদলাইলেও চর্চা বহাল রাখিবার অবিমৃষ্যকারিতা অব্যাহত রাখিয়াছে।
সাংবাদিকদের উপর হামলায় উদ্বেগ জানাইয়া সম্পাদক পরিষদ যথার্থই বলিয়াছে, ইহা কেবল কোনো পেশাজীবীর উপর আক্রমণ নহে; স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানিবার অধিকারের উপর আঘাত। আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস-সিপিজে আলোচ্য হামলার ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের যেই আহ্বান জানাইয়াছে, উহার বিকল্প নাই। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠিয়া ঘটনাটির ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে যেই দাবি জানাইয়াছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি, উহাও আইনের শাসনের প্রধান শর্ত। আমরা মনে করি, তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক হইতে হইবে এবং হামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় বিবেচনা না করিয়া আইনের আওতায় আনিতে হইবে।
এই গুরুতর অঘটনকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হতাশাজনক ভূমিকা রাখিয়াছে। বিশেষত ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রক্টর যেইভাবে অসহায়ত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, তাঁহার পদে থাকিবার যোগ্যতা লইয়াই প্রশ্ন উঠে। ‘পুলিশ ভয়ে পালাইয়া গিয়াছে’ মর্মে ভাষ্যও প্রশাসনের চরম দুর্বলতাই উন্মোচন করিয়াছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংকটকালে হস্তপদ সংকুচিত করিয়া লইলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও দায়িত্বরত সাংবাদিকগণ যাইবেন কোথায়? এমনকি ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীরা চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার যেইভাবে ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামিগণের বিরুদ্ধে মামলা করিয়াছেন, উহাতেই পরবর্তী কার্যক্রমের দৌড় স্পষ্ট হইয়া উঠে।
স্বীকার্য, আলোচ্য অঘটনের পর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের তিন নেতাকে বহিষ্কার এবং ছয়জনকে কারণ দর্শাইবার নোটিশ দিয়াছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কিন্তু কেবল বহিষ্কারই যথেষ্ট হইতে পারে না; অভিযুক্তদের বিচারকার্যে সহায়তাও জরুরি। তৎসহিত আত্ম-পর্যালোচনাও করিতে হইবে সংগঠনটিকে।
দশকের পর দশক ধরিয়া শিক্ষাঙ্গনগুলিতে ছাত্র রাজনীতির নামে যেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলিতেছে, উহার দায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি উপেক্ষা করিতে পারে না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেই আশা জাগিয়াছিল; পূর্ববর্তী সহিংস ঘটনাবলি এবং সাংবাদিকদের উপর রবিবারের হামলা প্রমাণ করিয়াছে– ক্ষমতার হস্তান্তর হইলেও ছাত্র রাজনীতির নামে সন্ত্রাসী তৎপরতা বহাল তবিয়তে। আমরা দেখিয়াছি, এই ঘটনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে ছাত্র সংগঠনগুলি নিন্দা জ্ঞাপন করিয়া আসিতেছে। কিন্তু কেবল নিন্দাই যথেষ্ট নহে; সাধারণ শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধই পারে এহেন সন্ত্রাসী কার্যক্রম রুখিয়া দিতে।
অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হইলে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও পেশিশক্তির অনাচার আরও বিস্তার লাভ করিবে। আমাদের আশা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্ব স্ব ব্যর্থতা ঝাড়িয়া ফেলিয়া অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়