ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যা

শ্বাপদসংকুল সাংবাদিকতা

শ্বাপদসংকুল সাংবাদিকতা
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সংঘটিত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ড পুনরায় দেখাইয়া দিল এই দেশে সাংবাদিকতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বৃহস্পতিবার রাত্রি সোয়া ৮টার দিকে উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজারের এক দোকানের সম্মুখে একদল দুর্বৃত্ত আলিফের উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে। স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁহাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লইয়া গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন। আলিফ একটি বেসরকারি আইপিটিভির জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেইসবুক পেইজ পরিচালনা করিতেন, যেইখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ বিষয়ে লেখালিখি করিতেন তিনি। গত বৎসরের ১০ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁহাকে কোপাইয়া জখম করে। তাঁহার এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁহাকেও অস্ত্র দেখাইয়া ধাওয়া করা হইয়াছিল। স্পষ্টত, এলাকাটি অপরাধীদের একপ্রকার অভয়ারণ্যে পরিণত হইয়াছে এবং পেশাগত কারণে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়াছে। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়া চলিয়াছে; তাহাদের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সহিত যোগসাজশ থাকিবার অভিযোগ উঠিলেও বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না। এই হত্যাকাণ্ডকে অবশ্যই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এক গুরুতর হুমকি হিসাবে দেখিবার সুযোগ রহিয়াছে। অথচ গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকালে প্রকাশিত দলীয় ইশতেহারে এবং নির্বাচিত হইয়া রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণকালে বর্তমান সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন।

গত বৎসরের ৭ আগস্ট রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে ধারালো অস্ত্র দিয়া কোপাইয়া একদল দুর্বৃত্ত হত্যা করিবার পর এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখিয়াছিলাম, জনগণকে সংবাদ জানাইবার আপাত নিরীহ কাজটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। ইতোমধ্যে বহু সময় পার হইলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি ঘটে নাই, বরং অবনতি ঘটিয়াছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র গত বৎসর প্রকাশিত উহার একটি প্রতিবেদনে বলিয়াছিল, ওই বৎসরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৬৬টি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়াছে। একই সময়ে উক্ত ৬৬টিসহ মোট ১৯৬টি ঘটনা ঘটিয়াছে, যেখানে রহিয়াছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দ্বারা সংবাদকর্মীদের হুমকি প্রদান, খবর প্রকাশের জন্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ইত্যাদি ঘটনা। এদিকে, একই সংস্থার আরেকটি প্রতিবেদন বলিতেছে, গত জানুয়ারি হইতে সেপ্টেম্বর অবধি দেশের বিভিন্ন স্থানে খুনের হুমকিসহ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ছিল অন্তত ৩০০টি। 

স্বীকার্য, দেশে কোনোদিনই সাংবাদিকতা ঝুঁকিহীন ছিল না। তদুপরি, দীর্ঘদিন ধরিয়া বিরাজমান এই সমস্যা রাতারাতি নিরসন করা যাইবে না। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে মতপ্রকাশের অধিকার তথা স্বাধীন সাংবাদিকতার যে অঙ্গীকার আন্দোলনকারীদের মুখে মুখে ছিল, উহা স্মরণে রাখিয়া বর্তমান সরকারের উচিত ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতাবিরোধী অতীতের ঘটনাবলির ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাহা তো হয়ই নাই, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ন্যক্কারজনকভাবে দুইটি সংবাদপত্রের প্রধান কার্যালয়ে যে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, সেই সকল ফৌজদারি অপরাধের বিচার অদ্যাবধি হয় নাই। অবশ্য, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির কারণে যেই জননিরাপত্তা সংকট চলিতেছে, তাহার মধ্যে সাংবাদিকদের সুরক্ষা একপ্রকার সোনার পাথরবাটির মতো।

তবে আমাদের প্রত্যাশা, বিগত সময়ে মানিক সাহাসহ বিভিন্ন সাংবাদিক হত্যার বিচার উপেক্ষিত হইবার পুনরাবৃত্তি আলোচ্য ঘটনায় ঘটিবে না। স্বল্প সময়ের মধ্যে যথাযথ তদন্তপূর্বক দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হইবে। যেই গণতন্ত্রের জন্য এই জনপদে গত কয়েক দশকে বারংবার রক্ত ঝরিয়াছে এবং যে গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত স্বাধীন সাংবাদিকতা, তাহা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকিতে পারে না।

আরও পড়ুন

×