সৌদি-হুতি সংঘাত
সতর্কতা সর্বাগ্রে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংঘাত-সংঘর্ষ ইতোমধ্যে যেই পর্যায়ে উপনীত, তাহা বিশেষত বাংলাদেশের জন্য এক বহুমুখী সংকটের বার্তা দিতেছে। গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং কয়েকজন গুরুতর আহত হইয়াছেন। ফলে দেশটিতে কর্মরত প্রায় ৩৫ লক্ষ বাংলাদেশির নিরাপত্তা সংকট দেশে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট পরিবারসমূহ, তৎসহিত বাংলাদেশ সরকারেরও শিরঃপীড়ার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কেবল উহাই নহে; সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর অনিরাপদ হইয়া পড়ায় সেই দেশমুখী বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটিতেছে। যাহার প্রভাব পড়িয়াছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও।
সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ হইতে সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মাম, জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দরে নিয়মিত বিমান চলাচল করে। মঙ্গলবার পর্যন্ত এহেন ৬২টি উড়ান বাতিল হইয়াছে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন যাত্রীরা। একদিকে উড়ান বাতিল সম্পর্কে আগাম বার্তা না পাওয়ায় বিমানবন্দরে বিপাকে পড়িয়াছেন যাত্রীরা এবং দুর্ভোগে পড়িয়াছেন তাহাদের বিদায় জানাইতে বিমানবন্দরে আসা স্বজনরা। অন্যদিকে ভিসা ও ছুটির মেয়াদ শেষ হইবার উপক্রম হওয়ায় অনেকের দুশ্চিন্তা কয়েক গুণ হইয়াছে। এই অবস্থা অধিক দিবস চলিলে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হইবেন না শুধু; রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্যও তাহা ক্ষতি বহিয়া আনিবে।
প্রসঙ্গত, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিস্থিতি যখন হতাশাজনক তখন বিশেষত সৌদি আরব বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অদক্ষ শ্রমিকের জন্য আশার আলো হইয়া উঠিয়াছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বৃহত্তম গন্তব্য এখনও সৌদি আরব। কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই সৌদি আরব প্রায় ৩৩ সহস্র কর্মীর জন্য ছাড়পত্র দিয়াছে। উপরন্তু রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। গত অর্থবৎসরেও সৌদি আরব হইতে বাংলাদেশ মোট প্রবাহের প্রায় ১৬.৪ শতাংশ রেমিট্যান্স পাইয়াছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে সৌদি আরব হইতে। চলমান সংঘাত সেই তৈলপ্রবাহেও ব্যাঘাত ঘটাইতে পারে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এমন সময়ে সৃষ্টি হইতে চলিয়াছে যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং বিগত সরকারগুলির ন্যায় এই সরকারেরও কতিপয় ভ্রান্ত পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করিয়াছে।
আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে যদ্রূপ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সহিত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাইতে হইবে, তদ্রূপ রেমিট্যান্স ও জ্বালানির বিকল্প উৎসগুলির ব্যাপারে দ্রুত মনোযোগ বৃদ্ধি করিতে হইবে। তবে আশু অগ্রাধিকার হইল, সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ ও জনসমাগমপূর্ণ স্থান পরিহার করা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ সকল নির্দেশনা মান্য করিবার যেই আহ্বান জানাইয়াছে, সেইগুলির বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণও জরুরি। বাংলাদেশ হইতে সৌদিমুখী উড়ান পরিচালনাকারী বিমান সংস্থাগুলির সহিত বিমানবন্দরে ভুক্তভোগী যাত্রী ও তাহাদের স্বজনদের সুবিধা-অসুবিধা পর্যবেক্ষণকারী সকলের প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যেই সকল নির্দেশনা জারি করিয়াছে, সেইগুলিও উপেক্ষা করা যাইবে না।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের যেই কোনো বিমানবন্দরে উড়ান পরিচালনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং উড়ান বাতিল, বিলম্ব বা সময়সূচি পরিবর্তনের সংবাদ যাত্রীদের সম্ভাব্য সকল উপায়ে জানানো এবং এই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতকরণে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এয়ারলাইন্সগুলিকে নির্দেশনা দিয়াছে। ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি বা অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহিত যোগাযোগে সহায়তা করিতে যেই নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে, তাহাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা, এই সকল নির্দেশনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বাস্তবায়িত হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়