সাতক্ষীরায় যুবককে হত্যা
অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কাম্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাতক্ষীরায় তথাকথিত তৌহিদী জনতার গণপিটুনিতে যেইভাবে ওহিদুজ্জামান শামীম নামে এক যুবকের প্রাণহানি ঘটিয়াছে, তজ্জন্য কেবল ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশই যথেষ্ট নহে। ঘটনাটি নিছক আইনশৃঙ্খলার বিষয়ও নহে। পারিবারিক কলহের জের ধরিয়া স্ত্রীর সহিত ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড করিয়া ছড়াইয়া দিয়া যেইভাবে মব সন্ত্রাস চালানো হইয়াছে, উহাকে কেবল উন্মুক্ত জনতার আচরণ হিসাবে আখ্যা দেওয়া কঠিন। ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, শামীম কয়েক বৎসর পূর্বে বাসে যাতায়াতকালে ‘অজ্ঞান পার্টি’র খপ্পরে পড়িলে পরিবারের সদস্যরা তাঁহাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। চিকিৎসায় শারীরিকভাবে সুস্থ হইলেও প্রায়শ মানসিকভাবে বিকারগ্রস্তের ন্যায় আচরণ করিতেন তিনি। এইরূপ একজন ব্যক্তিকে প্রথমে উস্কাইয়া দিয়া পরে হামলা করিয়া হত্যা করিবার নেপথ্যে গভীর জিঘাংসা ব্যতীত আর কী থাকিতে পারে!
প্রথম দফায় গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হইয়া হাসপাতালে ভর্তির পর দ্বিতীয় দফায় সেইখান হইতে ছিনাইয়া লইয়া যেইভাবে হত্যা করা হইয়াছে, তাহাতে এর নেপথ্য খলনায়কদের নৃশংস মনোবৃত্তিও স্পষ্ট। বস্তুত আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লইয়া কোনো ব্যক্তিকে এহেন শাস্তি দিবার প্রবণতা আদৌ গ্রহণযোগ্য নহে। উপরন্তু এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা লইয়াও গুরুতর প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈয়ার হইয়াছে। মঙ্গলবার দুপুর হইতে ঘটনাবলি চাঞ্চল্য তৈয়ার করিলেও স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন কী দায়িত্ব পালন করিয়াছে? সাতক্ষীরার ঘটনায় প্রথম দফায় হামলার পর ভুক্তভোগীকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা এবং চিকিৎসা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের। এই ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। যেইভাবে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির উপর হামলা হইয়াছে, তাহাতে হামলাকারীদের নিকট মানবিকতা প্রত্যাশা করা বৃথা। হাসপাতালে কেন উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা লওয়া হইল না– উহাই এখন বৃহৎ প্রশ্ন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘তৌহিদী জনতা’ কাহারা– সেই প্রশ্নেরও গুরুতর অনুসন্ধান জরুরি। আমরা ইতোপূর্বে দেখিয়াছি, তৌহিদী জনতার ব্যানারে নানাবিধ সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাধা ও স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। সিনেমা প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা কিংবা পর্যটকদের হেনস্তার ঘটনা যদ্রূপ দেখা গিয়াছে, তদ্রূপ ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া অপরকে হত্যার হুমকি দিবার ন্যায় বিপজ্জনক ঘটনাও চলমান।
ধর্মীয় বিষয় লইয়া কটূক্তি কিংবা অপরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতিতে আঘাত কাহারও কাম্য নহে। কিন্তু এই প্রকার অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রহিয়াছে। কেহ ধর্মীয় বিষয় লইয়া কটূক্তি করিলে তাহার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত এই দেশে কম নাই। তৎপরিবর্তে আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লইবার জন্য অতি উৎসাহী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবর্গ সমাজ ও দেশের কল্যাণকামী হইতে পারে না। বরং তাহারা যে সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই বিনষ্ট করিতে চায়– অতীতে বারংবার তাহা প্রমাণিত। এই সকল ঘটনায় আমরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া আসিতেছি; সাতক্ষীরার অঘটনে উহা বৃদ্ধি বৈ হ্রাস পাইল না। আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লইবার এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দূর হইবে কবে?
আমরা প্রত্যাশা করিয়াছিলাম, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততা, ক্ষেত্রবিশেষ উস্কানিতে যেই মব সহিংসতার বাড়বাড়ন্ত ঘটিয়াছিল; নির্বাচিত সরকারের শাসনামলে উহা নিয়ন্ত্রণে আসিবে। ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াই বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, মবের অপসংস্কৃতি রোধে সরকার শ্যেন দৃষ্টিসহ জাগ্রত। কিন্তু বাস্তবে উহা হ্রাসের পরিবর্তে নূতন নূতন মাত্রা গ্রহণ করিতেছে। আমরা মনে করি, বিলম্বে হইলেও মব সন্ত্রাস প্রতিহতে সরকারের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর বার্তা দিবার বিকল্প নাই। আমরা দেখিতে চাহি, সাতক্ষীরার যুবকের প্রাণহানি মব সহিংসতার শেষ ঘটনা হইয়াছে। ঐ ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে ষড়যন্ত্রকারী, উস্কানিদাতাসহ প্রত্যেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনয়ন করা না হইলে এই আশা দুরাশা হইয়াই থাকিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়