এলপিজি সংকট
ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষার বিকল্প নাই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এলপিজি ব্যবসায়ীদের আহূত ধর্মঘট সম্মুখে রাখিয়া বাজার হইতে পণ্যটি উধাও হইবার খবরটি উদ্বেগজনক হইলেও বিস্ময়কর নহে। গত সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে কতিপয় দাবি উত্থাপন করিয়া বৃহস্পতি ও শুক্রবার সমগ্র দেশে এলপিজি বিক্রয় বন্ধের ঘোষণা দিয়ছিল ‘এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’। যদিও বুধবারই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সহিত বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা; আর তাহাদের দাবির বিষয়ে ২৯ অক্টোবর গণশুনানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন। আমাদের প্রশ্ন অবশ্য অন্যত্র। ধর্মঘট শুরুর পূর্বে মঙ্গলবারই দেশের বহু এলাকায় বিশেষত সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে রন্ধনকার্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত জ্বালানি সিলিন্ডার সোনার হরিণ হইয়াছিল কেন? কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও যেইভাবে নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা পাঁচ-ছয়শত টাকা অধিক হাঁকা হইতেছিল কী কারণে? চলতি মাসের গোড়ায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ২৫২ টাকা বৃদ্ধি করিয়া ১ সহস্র ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করিয়াছিল বিইআরসি। দুই সপ্তাহ না যাইতেই মূল্যবৃদ্ধির দাবি উঠিল কোন যুক্তিতে?
আমরা জানি, পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাসের সুবিধা সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে থাকায় এলপিজি ইতোমধ্যে গ্রামাঞ্চলেও জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি, তৎসহিত সংগ্রহ কষ্টকর হইয়া পড়ায় বিভিন্ন মোটরযানেও এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধি পাইয়াছে। ফলে এলপিজির সংকট কেবল গৃহস্থালি কর্মেই ব্যাঘাত ঘটাইবে না; মনুষ্য চলাচলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলিবে। ইহাও বলা প্রয়োজন, দোকান হইতে এলপিজি এমন সময়ে উধাও হইল যখন সরকারি ভ্রান্ত নীতির কারণে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাস সংকট তীব্রতর এবং সকল প্রকার জ্বালানি তৈলের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারকারীরাও এলপিজির মধ্যে ভরসা খুঁজিতেছিলেন। ফলে বিদ্যমান এলপিজি সংকট দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের নিকট বোঝার উপর শাকের আঁটির ন্যায়।
অবশ্য এমন পরিস্থিতি এই দেশে নূতন নহে। ইতোপূর্বে জ্বালানি তৈল ও ভোজ্যতৈল লইয়াও ভোক্তাদের অনুরূপ যন্ত্রণায় পড়িতে হইয়াছিল। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গত এপ্রিলে হঠাৎ পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকট দেখা দেয়, যদিও এই দুই জ্বালানির চাহিদার সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এক পর্যায়ে সরকার এইগুলির মূল্য বৃদ্ধি করিলে পেট্রোল-অকটেন সংকট তাৎক্ষণিক মিটিয়া যায়। সর্বাধিক ব্যবহৃত সয়াবিন তৈলের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বে একাধিকবার একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বিশেষত আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে নিত্যপণ্যটির ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকারের উপর চাপ তৈরির অপকৌশলের ফলস্বরূপ। দুর্ভাগ্যজনক, প্রতিটা ক্ষেত্রেই সরকার গৃহীত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অনুকূলেই যায়, যদিও গণতান্ত্রিক সরকার হিসাবে তাহার নিকট ভোক্তাস্বার্থ প্রাধান্য পাইবার কথা। এলপিজির ক্ষেত্রেও সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ হইতে ১৫০ টাকা ধার্য করা বা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ নির্ধারণের দাবি। চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ, পরিবহন ভাড়া দেওয়া, অযৌক্তিক জরিমানা বন্ধসহ আরও ছয়টি দাবি তাহারা উত্থাপন করিয়াছেন। তাহাদের আরও অভিযোগ, আমদানিকারক কোম্পানিগুলি সরবরাহ হ্রাস করিয়া দেওয়ায় বিদ্যমান সংকটের উদ্ভব হইয়াছে। তবে আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করিয়াছে, দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ পর্যাপ্ত। নির্ধারিত মূল্যের বেশি লওয়া হইলে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লওয়ার দাবিও করিয়াছে সংগঠনটি। এই প্রেক্ষাপটে অন্তত পেট্রোল-অকটেন ও ভোজ্যতৈল সম্পর্কিত সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এমন সম্ভাবনা উড়াইয়া দেওয়া যায় না যে, ব্যবসায়ীদের দাবি মিটানো হইলেই এলপিজি বাজারে দৃশ্যমান হইবে। আমরা মনে করি, সর্বক্ষেত্রে ভোক্তাস্বার্থ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার দ্রুত এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ লইবে। ভোক্তাদের জিম্মি করিয়া বিভিন্ন নিত্যপণ্যের সংকট সৃষ্টির এই ধারাবাহিকতা আর চলিতে দেওয়া যায় না।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়