ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নারীর প্রীতি ফুটবলে বাধা

স্থগিত খেলাটি মাঠে গড়াইতে হইবে

স্থগিত খেলাটি মাঠে গড়াইতে হইবে
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির আপত্তির মুখে নারীদের একটি পূর্বনির্ধারিত প্রীতি ফুটবল খেলার আয়োজন স্থগিত হইবার সংবাদ উদ্বেগজনক হইলেও বিস্ময়কর নহে। সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাব এবং দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যকার এ প্রতিযোগিতাই প্রথম স্থগিত হইল না। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তির আপত্তিকে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন যেইভাবে আমলে লইয়া খোদ ফুটবল খেলাটি স্থগিত করিয়াছে, উহা বিস্ময়কর। 

সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতে প্রতিবেদনমতে, স্থানীয় একটি প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিরা প্রশাসনের নিকট আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন– এই রূপ ফুটবল খেলার আয়োজন করা হইলে ‘অশ্লীলতা’ ছড়াইতে পারে এবং যুবসমাজের চরিত্র বিনষ্ট হইতে পারে। এই জাতীয় মানসিকতা কেবল পশ্চাৎপদতা ও সংকীর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ নহে, বরং নারীর অধিকার ও অগ্রগতির পরিপন্থি। সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন ক্রীড়াচর্চাকে ‘অশ্লীলতা’র সহিত মিশ্রিতকরণ সুস্থ চিন্তা হইতে পারে না। বস্তুত খেলাধুলা শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায় এবং যুবসমাজকে নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হইতে দূরে রাখিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আপত্তিকারীরা না হয় পশ্চাৎপদ চিন্তায় আচ্ছন্ন; প্রশাসনও প্রগতিশীল ভূমিকা লইতে ব্যর্থ হইয়াছে। এমনকি আইন ও ন্যায্যতারও বিস্মৃতি এই ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট।
স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব পাঁচ দিন পূর্বেই প্রশাসনকে লিখিতরূপে অবহিত করিয়া উহার অনুলিপি সংরক্ষিত করিলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং দিরাই সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার যেইভাবে উহা অস্বীকার করিয়াছেন, তাহাতে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক দৃঢ়তার ঘাটতি স্পষ্ট। বিশেষত আপত্তিকারীদের সহিত আয়োজকদের ‘সমঝোতা’ করিবার যেই বার্তা স্থানীয় প্রশাসন দিয়াছে, উহা কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। 

স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং ক্রীড়াবিদদের যথাযথ সুরক্ষা প্রদানপূর্বক সুষ্ঠুভাবে ফুটবল খেলাটি সম্পন্নকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সামাজিক আপত্তির নামে এই রূপ চাপের মুখে পশ্চাদপসরণ করিলে দেশে উগ্রবাদিতা ও অসহিষ্ণুতারই সম্প্রসারণ ঘটিতে থাকিবে। বস্তুত খেলাধুলার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির কোনো সুযোগ নাই। সাফ নারী ফুটবলে আমাদের কন্যাদের আন্তর্জাতিক বিজয় যখন সমগ্র জাতিকে গর্বিত করিয়াছে, তখন দেশের অভ্যন্তরে নারীদের ফুটবল খেলার প্রীতিময় আয়োজনে বাধা প্রদানের ঘটনা হতাশাজনক বটে। প্রগতি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে বেগবান রাখিতে হইলে নারীদের গৃহবন্দি করিয়া রাখিবার মানসিকতা হইতে বাহির হইয়া আসিতেই হইবে।
আমরা মনে করি, যেই কোনো মূল্যে দেশের সকল অঞ্চলে সুস্থ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখিবার বিকল্প নাই। স্থানীয় প্রশাসনকেও দৃঢ়তা প্রদর্শন এবং নারীদের সকল প্রকার বৈষম্যহীন ক্রীড়া কার্যক্রমে নিরাপত্তা বিধান করিতে হইবে। সমাজ বিনির্মাণে নারী ও পুরুষের সমান অবদান অনস্বীকার্য। তাই খেলাধুলার ন্যায় ইতিবাচক ক্ষেত্রে নারীদের উন্মুক্ত সুযোগ নিশ্চিতকরণ হউক আমাদের অঙ্গীকার।

আমরা ইহাও দেখিতে চাহিব, সুনামগঞ্জে নারীদের ফুটবল খেলায় বাধা সৃষ্টির পরিস্থিতি যথাযথভাবে খতাইয়া দেখা হইবে। আপত্তিকারীরা কাহারা এবং তাহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, উহাও অনুসন্ধান জরুরি। সর্বোপরি স্থগিত হইয়া যাওয়া খেলাটি যেই কোনো মূল্যে পুনরায়োজন করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হইতে হইবে। স্মরণে রাখিতে হইবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে এইরূপ বাধা সরকার ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মোকাবিলা করা গিয়াছে। সুনামগঞ্জেও উহা নিশ্চয় সম্ভব।

আরও পড়ুন

×